পুরুলিয়ার ‘ভূতুড়ে’ বেগুনকোদর স্টেশন! বিজ্ঞানের আলোয় কাটল আঁধার

পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড়ের কোলে অবস্থিত বেগুনকোদর রেলওয়ে স্টেশন, যা একসময় তার “ভূতুড়ে” অতীতের জন্য পরিচিত ছিল, দীর্ঘ অর্ধ-শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে চলে আসা সেই কুখ্যাতি থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসছে। নৈসর্গিক সৌন্দর্যে ঘেরা এই ছোট্ট স্টেশনটি বর্তমানে তার হারানো গৌরব পুনরুদ্ধারের পথে।

পুরুলিয়া জেলার ঝালদা শহরের কাছে বেগুনকোদর গ্রামে ৬৫ বছর আগে এই স্টেশনটি তৈরি হয়েছিল। দক্ষিণ-পূর্ব রেলের রাঁচি ডিভিশনের মুরি-কোটশিলা শাখার অধীনে থাকা এই স্টেশনটি ১৯৬০ সালে হল্ট স্টেশন হিসেবে যাত্রা শুরু করে। তবে, মাত্র ৭ বছরের মধ্যেই, ১৯৬৭ সালে, ভূতের গুজবের জেরে স্টেশনটি বন্ধ হয়ে যায়। স্থানীয়দের মধ্যে ভূতের ভয় এতটাই ছড়িয়ে পড়েছিল যে দিনের বেলাতেও কেউ স্টেশনের আশেপাশে যেতেন না, রাতের কথা তো বলাই বাহুল্য। স্টেশনটি প্ল্যাটফর্ম বা আলোর ব্যবস্থা না থাকায় সন্ধ্যার পর এক গা ছমছমে পরিবেশ তৈরি হত। রেল কর্তৃপক্ষ কর্মী নিয়োগে ব্যর্থ হয়ে স্টেশনটি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়।

ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতির সদস্যরা এই কুসংস্কার ভাঙতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তারা ভূত চতুর্দশীর দিন স্টেশনে রাত্রিযাপন করে ভূতের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে পারলে পুরস্কার ঘোষণা করেন। বিজ্ঞান মঞ্চের এই সাহসী পদক্ষেপ স্থানীয়দের মন থেকে ভয় দূর করতে সাহায্য করে। ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতির পুরুলিয়া জেলা সম্পাদক মধুসূদন মাহাতো বলেন, “ভূত বলে কিছু নেই। স্টেশন মাস্টার বদলি চেয়েছিলেন বলেই এই গুজব রটিয়েছিলেন।”

৪২ বছর বন্ধ থাকার পর ২০০৯ সালে তৎকালীন রেলমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগে বেগুনকোদর স্টেশন পুনরায় চালু হয়। বর্তমানে এই হল্ট স্টেশনে চারটি প্যাসেঞ্জার ট্রেন থামে। রাঁচি রেলওয়ে ডিভিশনের ডিআরএম জসমীত সিং বিন্দ্রা জানান, গত দুই বছরে স্টেশনটিতে প্ল্যাটফর্ম উঁচু করা এবং ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণের মতো বেশ কিছু পরিষেবা উন্নত করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন যে, যাত্রী সংখ্যার নিরিখে স্টেশনে পর্যাপ্ত পরিকাঠামো রয়েছে। যদিও স্টেশনে কোনো স্থায়ী রেলকর্মী নেই, তবে একজন চুক্তিভিত্তিক এজেন্টের মাধ্যমে টিকিট বিক্রি করা হয়।

স্টেশনটিতে ছাউনি, প্ল্যাটফর্ম, ফুটওভার ব্রিজ সবই তৈরি হয়েছে এবং সাধারণ মানুষের মনে ভূতের ভয়ও কমেছে। স্থানীয় বাসিন্দা মৃত্যুঞ্জয় কুমার বলেন, “এখন আর আগের মতো আতঙ্ক নেই। সকাল-সন্ধ্যায় যাত্রীরা যাতায়াত করেন।”

তবে, দিনের বেলায় বিশেষ করে দুপুরে স্টেশন চত্বর এখনও বেশ নির্জন থাকে। ট্রেন থেকে নামা হাতেগোনা দু-একজন যাত্রীও ক্যামেরার সামনে কথা বলতে রাজি হননি। স্টেশনে এখনও কোনো রেলকর্মী স্থায়ীভাবে নিযুক্ত না থাকায় এবং চুক্তিভিত্তিক কর্মী নির্দিষ্ট ট্রেনের সময় ছাড়া না আসায় স্টেশনটি সম্পূর্ণভাবে কর্মচঞ্চল হয়ে ওঠেনি। কোথাও যেন এখনও রহস্যের এক আবছা আভা ঘিরে রেখেছে বেগুনকোদরকে। ভূতের আতঙ্ক কমে এলেও, স্টেশনটি এখনও সম্পূর্ণরূপে তার অতীত থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি।