“সিভিক তোমার চিপস নাও, আমার ছেলেকে ফিরিয়ে দাও”-কিশোর মৃত্যুর প্রতিবাদে বিজেপির মিছিল

চুরির অপবাদ সহ্য করতে না পেরে আগাছানাশক খেয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেওয়া এক সপ্তম শ্রেণির পড়ুয়ার মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে পূর্ব মেদিনীপুরের পাঁশকুড়ায় ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। বৃহস্পতিবার দীর্ঘ লড়াইয়ের পর ওই ছাত্রের মৃত্যু হয়। এরপরই পুলিশের বিরুদ্ধে মৃতদেহ ‘ছিনিয়ে’ নিয়ে তড়িঘড়ি সৎকার করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে পরিবারের পক্ষ থেকে। এই ঘটনায় রাজ্য রাজনীতিতেও শোরগোল পড়ে গেছে।
রবিবার মৃত ছাত্রের বাড়িতে যান প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার। একই সময়ে সেখানে পৌঁছন স্থানীয় বিজেপি প্রধান মিতা বেসরা সরেন। দুই দলের নেতা-নেত্রীকে কাছে পেয়ে মৃত ছাত্রের পরিবারের সদস্যরা পুলিশের বিরুদ্ধে তাঁদের ক্ষোভ উগরে দেন।
পরিবারের অভিযোগ, পাঁশকুড়ার পুলিশ কার্যত জোর করে ছাত্রের দেহ নিয়ে গিয়ে তড়িঘড়ি সৎকার করে দেয় এবং দাহকার্যের কোনও রীতিও মানতে দেয়নি। রবিবার সন্ধ্যায় বিজেপি নেতৃত্বের সহায়তায় মৃত ছাত্রের বাবা-মা পাঁশকুড়া থানায় পৌঁছে সিভিক ভলান্টিয়ার শুভঙ্কর দীক্ষিত ও তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেওয়ার মামলা দায়ের করেছেন।
শুভঙ্কর সরকারের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন প্রদেশ কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক আশুতোষ চট্টোপাধ্যায়, জেলা কংগ্রেসের সভাপতি মানস কর মহাপাত্র, কংগ্রেস নেতা সমীর হোসেন এবং কল্যাণ রায়। তাঁরা মৃত ছাত্রের মা, দিদি, সৎ বাবা ও আত্মীয়দের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাঁদের অভিযোগ শোনেন। ছাত্রমৃত্যুকে কেন্দ্র করে গ্রামে পুলিশি অত্যাচার এবং তাঁদের সঙ্গে পুলিশের অমানবিক আচরণ নিয়ে মৃত ছাত্রের মা প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি ও বিজেপি প্রধানের সামনে পাঁশকুড়া পুলিশের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
মৃত ছাত্রের মায়ের অভিযোগ, “বৃহস্পতিবার রাতে পুলিশ লাঠিচার্জ করে সবাইকে সরিয়ে দেয়। গ্রামের লোকজনকে ছেলের দেহ পর্যন্ত দেখতে দেওয়া হয়নি। পুলিশ আমার ছেলেকে ছিনিয়ে নিয়ে চলে যায়। পাঁশকুড়া থানার আইসি সমর দে জানান, পাঁচ মিনিটের মধ্যে দেহ দাহ না-করা হলে তিনি আমার ছেলের দেহ নদীর জলে ভাসিয়ে দেবেন অথবা মর্গে পাঠিয়ে দেবেন।”
তিনি আরও বলেন, “পুলিশ নিজেরাই দাহকার্যের কাঠ মাথায় করে শ্মশানে গিয়েছিল। গ্রামের কাউকে সেখানে যেতে দেওয়া হয়নি। পুলিশ দাহকার্যের কোনও রীতি মানতে দেয়নি। ফলে, ছেলের কাজ আমরা পনেরো দিনের মধ্যে নয়, ৪৫ দিনের মাথায় করতে পারব! ছেলেটা তো চলেই গেল। মৃত্যুর পরেও তার কি এ সব প্রাপ্য ছিল?”
এই ঘটনার প্রতিবাদে রবিবার সন্ধ্যায় পাঁশকুড়ার পিডব্লিউডি ময়দান থেকে থানা পর্যন্ত একটি বিক্ষোভ মিছিল করে বিজেপি। মিছিলে অনেককে চিপসের মালা গলায় হাঁটতে দেখা যায়। মিছিল শেষে দু’জন আইনজীবীকে সঙ্গে নিয়ে মৃত ছাত্রের মা থানায় এফআইআর দায়ের করেন।
বিজেপির রাজ্য কমিটির সদস্য সিন্টু সেনাপতি বলেন, “পাঁশকুড়া থানা এলাকায় সিভিক ভলান্টিয়ারদের একাংশ নিজেদের ডিজি ভাবেন। শুভঙ্কর দীক্ষিত ছাত্রটিকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করায় সে অপমানে আত্মঘাতী হয়। শুভেন্দু অধিকারীর নির্দেশে আমরা পরিবারটিকে আইনি সহায়তা দিয়েছি। ভবিষ্যতেও পাশে থাকব।”
পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ প্রসঙ্গে পাঁশকুড়ার আইসি সমর দে বলেন, “রীতি মেনেই দাহ করা হয়েছে। দাহের সময়ে মৃতের পরিবারের আত্মীয়রাও ছিলেন। বরং ছেলেটির বাবা উপস্থিত ছিলেন না। যাঁদের গ্রেফতার করা হয়েছে তাঁদের সবাইকে ভিডিয়ো ফুটেজে হামলা করতে দেখা গিয়েছে। বাকি অভিযুক্তরা পলাতক।”
তিনি আরও জানান, “মৃত ছাত্রের মা রবিবার থানায় এসে শুভঙ্কর দীক্ষিত-সহ মোট চার জনের বিরুদ্ধে এফআইআর করেছেন। আমরা তদন্তও শুরু করেছি।” এফআইআর-এ অভিযুক্তদের তালিকায় সিভিক ভলান্টিয়ার শুভঙ্কর দীক্ষিতের পাশাপাশি তাঁর বাবা ও স্ত্রীর নামও রয়েছে।
পূর্ব মেদিনীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নিখিল আগরওয়াল বলেন, “পুলিশ ওই ছাত্রের দেহ ছিনিয়ে দাহ করে দিয়েছে, এমন অভিযোগ ভিত্তিহীন। মৃত ছাত্রের মা রবিবার এফআইআর করেছেন। অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্তও শুরু হয়েছে।”
মৃত ছাত্রের মা দৃঢ় কণ্ঠে বলেছেন, “যাঁদের কারণে আমার ছেলে আত্মহত্যা করেছে, তাঁদের বিরুদ্ধে থানায় এফআইআর করেছি। পুলিশ এ বার অভিযুক্তদের গ্রেফতার করুক।” এই ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে এবং তদন্তের ফলাফলের দিকে নজর রাখছে সকলে।