বিশেষ: বিদ্যুৎ ছাড়াই বাতাস থেকে জল সংগ্রহের উপায় পেলেন বিজ্ঞানীরা, আবিষ্কৃত নতুন উপাদান

বিজ্ঞানের দুনিয়ায় দুর্ঘটনাক্রমে এক চমকপ্রদ আবিষ্কার করেছেন গবেষকরা। তারা এমন এক নতুন উপাদান খুঁজে পেয়েছেন, যা বিদ্যুৎ বা বিশেষ কোনো যন্ত্রপাতি ছাড়াই বাতাস থেকে জল টেনে আনতে পারে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই আকস্মিক আবিষ্কার শুষ্ক অঞ্চলে জল সরবরাহের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে এবং ইলেকট্রনিক্স বা ভবনকে আরও সহজে ঠাণ্ডা করতে সাহায্য করবে।

‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’ জার্নালে প্রকাশিত এই যুগান্তকারী গবেষণাটি এক ল্যাব পরীক্ষার সময় ঘটে যাওয়া এক অপ্রত্যাশিত ঘটনা থেকে শুরু হয়েছিল। ইউনিভার্সিটি অফ পেনসিলভানিয়ার পিএইচডি শিক্ষার্থী ভরথ ভেঙ্কাটেশ একটি ধাতব উপাদানের ওপর জলের ফোঁটা তৈরি হতে দেখেন। অবাক করা বিষয় হলো, এই উপাদানটি ঠাণ্ডা করা ছিল না এবং ল্যাবের আর্দ্রতাও খুব বেশি ছিল না। তাহলে জলের ফোঁটা এলো কোথা থেকে?

প্রথমদিকে গবেষণা দলটি ভেবেছিল ল্যাবের পরিবেশের কারণে কোনো ভুল থেকে এমনটি ঘটেছে, যেমনটি বিজ্ঞানভিত্তিক সাইট নোরিজ জানিয়েছে। তবে আরও পরীক্ষা করে দেখা গেল, এখানে আসলেই কিছু একটা ঘটছে।

ইউনিভার্সিটি অফ পেনসিলভানিয়ার প্রফেসর ডায়েওন লি ও আমিশ প্যাটেলের নেতৃত্বে গবেষকরা এমন এক নতুন ধরনের উপাদান আবিষ্কার করেছেন, যার মধ্যে ছোট ছোট ন্যানোপোর থাকে। এই ন্যানোপোরগুলো এমনভাবে জল টেনে আনে ও স্থানান্তরিত করে, যা আগে কেউ দেখেনি বলে দাবি তাদের।

গবেষকরা বলছেন, এই নতুন ধরনের উপাদান তৈরি হয়েছে জল পছন্দ করে এমন বা হাইড্রোফিলিক ন্যানোপার্টিকল এবং জল প্রতিরোধী বা হাইড্রোফোবিক প্লাস্টিককে সঠিক ভারসাম্যে মিশিয়ে। অন্যান্য অনেক উপাদানে বাতাসের জলীয় বাষ্প ছোট ছিদ্রে জমে যায় কিন্তু ভেতরেই আটকে থাকে। তবে এই নতুন উপাদানে জল কেবল ছিদ্রে ঢুকে যেতেই পারে না, বরং তা ওপরে উঠে আসে ও ফোঁটা তৈরি করে, যেটি একেবারেই নতুন এক আচরণ।

আরও বিস্ময়কর বিষয় হচ্ছে, জলের এসব ফোঁটা সহজে শুকিয়ে যায় না। যদিও, সাধারণভাবে পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম অনুসারে এমনটি হওয়ার কথা নয়। নিশ্চিত হওয়ার জন্য গবেষণা দলটি এই উপাদানের আরও পুরু সংস্করণ পরীক্ষা করে দেখেছে। তারা দেখলেন, উপাদানটি যত পুরু হয়, ততই বেশি জল সংগ্রহ করছে। এতে প্রমাণ মেলে, জল কেবল বাইরের পৃষ্ঠের ওপর ঘনীভূত হচ্ছে বা জমছে না, বরং উপাদানের ভেতর থেকেও উঠে আসছে।

ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপে তোলা ভিডিওতেও দেখা গিয়েছে, একটি ধারাবাহিক চক্র চলছে, যেখানে জল ছোট ছিদ্রগুলোর ভেতরে জমছে, তারপর ওপরে উঠে আসছে ও এভাবে স্থির ফোঁটা তৈরি করছে।

গবেষকরা বলছেন, এই আচরণটির কারণ হচ্ছে উপাদানের ভেতরে থাকা লুকানো জল সংরক্ষণের একটি নেটওয়ার্ক। এই ছোট ছোট জলাধারগুলো বাতাস থেকে আর্দ্রতা টেনে নেয় ও তা ওপরে পাঠায়। ফলে ধারাবাহিক এক প্রক্রিয়া তৈরি হয়। জল টানার (হাইড্রোফিলিক) ও জল ঠেকানোর (হাইড্রোফোবিক) এসব অংশের সঠিক ভারসাম্যই এই কাজটি সম্ভব করেছে।

সবচেয়ে রোমাঞ্চকর বিষয় হলো, এই উপাদানটি সাধারণ উপকরণ দিয়ে তৈরি এবং সহজ উৎপাদন পদ্ধতি ব্যবহার করে এটিকে বানানো যেতে পারে। বাস্তব জীবনে এর নানা ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হতে পারে, যেমন – শুষ্ক অঞ্চলে বিদ্যুৎ ছাড়াই জল সংগ্রহের যন্ত্র, আর্দ্রতার প্রতি সাড়া দেয় এমন আবরণ এবং পরিবেশবান্ধব উপায়ে ভবন বা বাড়িঘর ঠাণ্ডা করার ব্যবস্থা।

পুরো প্রক্রিয়াটি এখনও গবেষণাধীন পর্যায়ে থাকলেও, এই আকস্মিক আবিষ্কার আমাদের জল সংগ্রহ ও উত্তপ্ত পৃথিবীতে তাপ নিয়ন্ত্রণের ধরনই বদলে দিতে পারে।