“অনলাইনে কনটেন্ট নির্মাতাদের আয় কমছে”-হুমকিতে ইন্টারনেটে আয়ের সুযোগ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)-এর বিকাশ এবং সার্চ ইঞ্জিনগুলোর পরিবর্তিত আচরণ, বিশেষ করে ‘জিরো ক্লিক’ পদ্ধতি অনলাইনে কনটেন্ট নির্মাতাদের প্রচলিত আয়ের কাঠামোকে গুরুতরভাবে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে সতর্ক করেছেন ওয়েবসাইটের নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান ক্লাউডফ্লেয়ারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ম্যাথিউ প্রিন্স। তার মতে, ইন্টারনেটে কাজের ধরন এবং অনলাইনে অর্থ আয়ের প্রচলিত পদ্ধতিকে এই নতুন ব্যবস্থা পুরোপুরি ধ্বংস করতে পারে।
সম্প্রতি কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ম্যাথিউ প্রিন্স এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। তিনি বলেন, অনলাইনে তথ্য অনুসন্ধানের ধরন বদলে যাওয়ায় ওয়েবসাইটগুলো আগের মতো দর্শক বা ভিজিটর পাচ্ছে না। এতে বিজ্ঞাপন, নিবন্ধন বা পাঠকপ্রিয়তার মাধ্যমে কনটেন্ট নির্মাতাদের আয় কমে যাচ্ছে।
ম্যাথিউ প্রিন্স ব্যাখ্যা করেন, ওয়েবের আয়কাঠামো গত দেড় দশক ধরে মূলত নির্ভর করেছে অনলাইন সার্চের মাধ্যমে ব্যবহারকারীদের সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইটে পাঠানোর ওপর। একসময় গুগলে কিছু সার্চ করলে ব্যবহারকারীকে সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইটে পাঠানো হতো—এটা ছিল একধরনের ভারসাম্যপূর্ণ বিনিময়। অর্থাৎ অনলাইনের অধিকাংশ কর্মকাণ্ডের পেছনে ছিল সার্চ ইঞ্জিন।
‘জিরো ক্লিক’ সমস্যা:
বর্তমানে গুগল আগের মতোই তথ্য সংগ্রহ করলেও, ব্যবহারকারীকে নির্দিষ্ট ওয়েবসাইটে দর্শক হিসেবে পাঠানোর সংখ্যা অনেক কমে গেছে। প্রিন্স বলেন, “গুগলের সার্চ পেজেই ৭৫ শতাংশ প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাচ্ছেন ইন্টারনেট ব্যবহারকারী। ফলে মূল ওয়েবসাইটে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ছে না।” এ কারণে যেসব ওয়েবসাইট ট্রাফিকের ওপর নির্ভর করে আয় করত, তাদের জন্য পরিস্থিতি অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।
এআইয়ের ভূমিকা:
ওয়েবে কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের আয় কমার পেছনে এআই প্রযুক্তিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে মনে করেন ম্যাথিউ প্রিন্স। তিনি বলেন, বর্তমানে বিভিন্ন এআই প্রতিষ্ঠান ওয়েব থেকে বিপুল পরিমাণ কনটেন্ট সংগ্রহ করে নিজেদের মডেল প্রশিক্ষণ দিচ্ছে, কিন্তু সেই কনটেন্টের উৎসে অর্থাৎ মূল ওয়েবসাইটে ব্যবহারকারীদের ফেরত পাঠাচ্ছে না।
প্রিন্স কিছু পরিসংখ্যান দিয়ে বিষয়টি ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, গুগলের ক্ষেত্রে আগে ব্যবহারকারীকে ওয়েবসাইটে পাঠানোর অনুপাত ছিল ২:১, এখন সেটা ৬:১। কিন্তু ওপেনএআইয়ের (OpenAI) মতো এআই প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সেটা ২৫০:১, আর অ্যানথ্রপিকের (Anthropic) ক্ষেত্রে ৬,০০০:১। অর্থাৎ, তারা হাজার হাজার পেজ সংগ্রহ করলেও সেই ওয়েবসাইটে কার্যত কোনো দর্শক পাঠাচ্ছে না।
ইন্টারনেটের ভবিষ্যতের জন্য হুমকি:
ম্যাথিউ প্রিন্স সতর্ক করেছেন যে কনটেন্ট উৎসে ব্যবহারকারীদের না পাঠানোর এই প্রবণতা দীর্ঘ মেয়াদে ওয়েবের ভবিষ্যতের জন্য এক গুরুতর হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। তিনি বলেন, কনটেন্ট নির্মাতারা যদি তাদের পরিশ্রমের ন্যায্য আয় না করতে পারেন, তাহলে তাঁরা আর নতুন কনটেন্ট তৈরি করার প্রেরণা পাবে না। এর ফলে ইন্টারনেটে নতুন তথ্য ও সৃজনশীলতা কমে যাবে, যা দীর্ঘ মেয়াদে পুরো ইন্টারনেট–ব্যবস্থাই ভেঙে পড়তে পারে।
ম্যাথিউ প্রিন্সের এই বক্তব্য ডিজিটাল জগতের ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছে। এআই এবং সার্চ মডেলগুলোর কারণে কনটেন্ট নির্মাতাদের টিকে থাকার জন্য নতুন এবং টেকসই আয়ের মডেল খুঁজে বের করা এখন সময়ের দাবি।
সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে