বিশেষ: চাঁদের দুইদিক এত আলাদা দেখায় কেন? জেনেনিন কী বলছে বিশেষজ্ঞরা?

পৃথিবীর একমাত্র প্রাকৃতিক উপগ্রহ চাঁদকে দেখতে তার দুই গোলার্ধে আকাশ-পাতাল ভিন্ন। চাঁদের নিকটবর্তী দিক লাভা প্রবাহে ঢাকা মসৃণ পৃষ্ঠের অধিকারী, আর দূরবর্তী দিক এবড়োখেবড়ো পাথুরে। কেন এই পার্থক্য, তা নিয়ে বহু বছর ধরে বিজ্ঞানীরা গবেষণা করছিলেন। এবার সম্ভবত সেই রহস্যের কিনারা হলো। নতুন এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা চাঁদের পৃষ্ঠের নিচে দুটি গোলার্ধের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ অভ্যন্তরীণ পার্থক্য খুঁজে পেয়েছেন, যা এই ভিন্নতার কারণ ব্যাখ্যা করতে পারে।
চাঁদের যে দিকটি আমরা পৃথিবী থেকে সর্বদা দেখতে পাই, তা ‘নিকটবর্তী দিক’ নামে পরিচিত। এই অংশটি মূলত প্রাচীন লাভা প্রবাহের জমাট বাঁধা অন্ধকার উপাদানে আবৃত। অন্যদিকে, চাঁদের যে দিকটি পৃথিবী থেকে দেখা যায় না, সেই ‘দূরবর্তী দিক’ অপেক্ষাকৃত রুক্ষ এবং পাথুরে ভূখণ্ডে পূর্ণ। বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিনের অনুমান ছিল যে, চাঁদের অভ্যন্তরীণ গঠনের কোনো পার্থক্যের কারণেই হয়তো এর দুই পৃষ্ঠ দেখতে এত আলাদা হয়। নতুন গবেষণা সেই ধারণাকেই জোরালো প্রমাণ দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরির গবেষক দলটির নেতৃত্বে ছিলেন রায়ান পার্ক। তিনি জানান, তাদের গবেষণায় দেখা গেছে যে চাঁদের দৃশ্যমান বা নিকটবর্তী দিকটি পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণের প্রভাবে দূরের দিকের চেয়ে বেশি নড়াচড়া বা মোচড় খায়। এর সহজ অর্থ হলো, চাঁদের দুই গোলার্ধের অভ্যন্তরের গঠন সম্পূর্ণ ভিন্ন। রায়ান পার্ক আরও বলেন, “প্রথমবার ডেটা বিশ্লেষণের সময় এর ফলাফল দেখে আমরা এতটাই অবাক হয়ে গিয়েছিলাম যে, তা বিশ্বাসই করতে পারিনি। তাই ফলাফল যাচাইয়ের জন্য আমরা অনেকবার গণনা চালিয়েছি। সব মিলিয়ে আমাদের প্রায় দশ বছরের পরিশ্রমের ফল এই গবেষণা।”
চাঁদের দুই দিকের অভ্যন্তরীণ পার্থক্য বোঝার জন্য বিজ্ঞানীরা বিশেষ পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন। ২০১১ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে প্রায় এক বছর ধরে ‘ইবিবি’ ও ‘ফ্লো’ নামের দুটি মহাকাশযান চাঁদের চারপাশে প্রদক্ষিণ করেছিল। এই মহাকাশযানগুলো থেকে সংগৃহীত ডেটা ব্যবহার করে গবেষকরা পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ টানে চাঁদ কীভাবে সাড়া দিয়েছে তার একটি বিস্তারিত মানচিত্র তৈরি করেন। পৃথিবীর চারপাশে ঘোরার সময় চাঁদের মাধ্যাকর্ষণ শক্তি সামান্য ওঠানামা করে, যার ফলে চাঁদের অভ্যন্তরে একটি নির্দিষ্ট ধরনের নড়াচড়া বা ‘মোচড়’ তৈরি হয়।
এই নড়াচড়া বিশ্লেষণের মাধ্যমেই বিজ্ঞানীরা চাঁদের অভ্যন্তরীণ গঠন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উদঘাটন করতে সক্ষম হন। তারা দেখতে পান যে, চাঁদের নিকটবর্তী দিকের অভ্যন্তরীণ গঠন এর দূরবর্তী অংশের তুলনায় বেশি উষ্ণ। এই অভ্যন্তরীণ উষ্ণতার পার্থক্যই সম্ভবত পৃষ্ঠের উপর লাভা প্রবাহ এবং ভূখণ্ড গঠনের ভিন্নতার মূল কারণ।
গবেষকরা মনে করছেন, এই গবেষণা শুধু চাঁদ সম্পর্কেই নয়, সৌরজগতের অন্যান্য গ্রহ এবং মহাকাশীয় বস্তুগুলোর অভ্যন্তরীণ গঠন বুঝতেও সহায়ক হতে পারে। এই কৌশল কাজে লাগিয়ে গবেষক দলটি এরইমধ্যে বৃহস্পতি গ্রহ এবং ভেস্টা নামক গ্রহাণুর অভ্যন্তরীণ গঠনের মানচিত্র তৈরি করেছে। রায়ান পার্ক আশাবাদী যে, ভবিষ্যতে সৌরজগতের আরও অনেক রোমাঞ্চকর গ্রহ ও বস্তুর অভ্যন্তরীন রহস্য উন্মোচনে তাদের এই কৌশল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
ব্রিটিশ গণমাধ্যম স্কাই নিউজের প্রতিবেদনেও বিজ্ঞানীদের এই দীর্ঘদিনের অনুমানের সূত্রে এই নতুন আবিষ্কারের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।