Gold: সোনার দাম এতটা কীভাবে কমল? জেনেনিন আরও কতটা কমতে পারে? পড়েনিন বিস্তারিত

সপ্তাহের শুরুতেই ভারতীয় বাজারে সোনার দামে একটি অভূতপূর্ব পতন লক্ষ করা গেছে। সোমবার সন্ধ্যার দিকে ২৪ ক্যারেট বিশুদ্ধ সোনার ১০ গ্রামের দর আচমকাই নেমে আসে প্রায় ৯৩,০০০ টাকাতে। এই দরপতন এতটাই আকস্মিক ছিল যে বিনিয়োগকারী ও সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। মাত্র গত মাসেই যেখানে ১০ গ্রাম সোনার দাম ১ লক্ষ টাকার গণ্ডি ছাড়িয়ে গিয়েছিল, সেখানে এই বিশাল পতন সোনা কেনার পরিকল্পনা করছেন এমন অনেকের কাছেই একটি সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সোনা কেনা একটি বুদ্ধিমানের কাজ হতে পারে।

সোনার দামের এই আকস্মিক পতনের নেপথ্যে রয়েছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক কারণ। এর মধ্যে সবচেয়ে স্পষ্ট সম্পর্কটি দেখা যায় শেয়ার বাজারের উত্থানের সঙ্গে। সোমবার দেশের শেয়ার বাজারে ছিল এক তেজি ভাব। বোম্বে স্টক এক্সচেঞ্জের সেনসেক্স একদিনেই ২,৯৭৫.৪৩ পয়েন্ট বেড়ে ৮২,৪২৯.৯০-তে গিয়ে থেমেছে। একই সময়ে ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জের নিফটি ৯১৬.৭০ পয়েন্টের বিশাল উত্থানে ২৪,৯২৪.৭০-তে দাঁড়িয়েছে। শেয়ার বাজারে যখন এমন উল্লম্ফন দেখা যায়, তখন বিনিয়োগকারীদের একাংশ অপেক্ষাকৃত ‘নিরাপদ আশ্রয়’ হিসেবে বিবেচিত সোনা থেকে বিনিয়োগ সরিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কিন্তু বেশি লাভের সম্ভাবনা যুক্ত শেয়ারের দিকে ঝুঁকতে শুরু করেন। এটি সোনার চাহিদা কমিয়ে দেয়, যার ফলে দাম কমে আসে।

শেয়ার বাজারে এই আত্মবিশ্বাসের জোয়ারের পিছনে কাজ করেছে দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। প্রথমত, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সংঘর্ষবিরতি চুক্তি কার্যকর থাকা এবং সীমান্তে উত্তেজনা প্রশমিত হওয়ার ইঙ্গিত বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ইতিবাচক মনোভাব তৈরি করেছে। দ্বিতীয়ত, এবং সম্ভবত আরও বড় কারণটি হলো বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ আমেরিকা ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য শুল্ক (ট্যারিফ) সংক্রান্ত একটি চুক্তির ঘোষণা। এই দুটি ঘটনাই বিশ্ব অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা কমিয়েছে এবং ঝুঁকির প্রবণতা বাড়িয়েছে, যা সরাসরি সোনার মতো নিরাপদ সম্পদের চাহিদাকে প্রভাবিত করেছে।

সোমবার সন্ধ্যায় সোনার দামে যে পতন দেখা গেছে তা সত্যিই চমকপ্রদ। যেখানে গত শুক্রবার ২৪ ক্যারেট ১০ গ্রাম সোনার দাম ৯৬,৪০০ টাকা ছিল, সেখানে সোমবার সন্ধ্যায় তা ৯৩,০০০ টাকার কাছাকাছি নেমে আসে। অর্থাৎ মাত্র একদিনের মধ্যে সোনার দাম কমেছে প্রায় ৩,৪০০ টাকা। গত কয়েক মাসের ক্রমবর্ধমান মূল্যবৃদ্ধির নিরিখে দেখলে এই পতনকে অবিশ্বাস্যই মনে হবে।

কেবল ভারতের বাজারেই নয়, আন্তর্জাতিক বাজারেও সোনার দামে বড় পতন হয়েছে। আমেরিকার বাজার COMEX-এ সোনার দাম ১.১৩ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স দাঁড়িয়েছে ২,৫৫৭.৪০ ডলারে। এটি গত দু’মাসের মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার সর্বনিম্ন দর।

আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম কমার অন্যতম প্রধান কারণ হলো আমেরিকা ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য শুল্ক বিতর্ক অবসান হওয়া। প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলে দুই দেশের মধ্যে যে বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু হয়েছিল এবং পারস্পরিক পণ্যের উপর উচ্চ হারে শুল্ক বসানো হয়েছিল, তা বিশ্ব বাজারে এক ধরনের উত্তেজনা এবং অনিশ্চয়তা তৈরি করেছিল। এই অনিশ্চয়তার সময়ে বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সোনার দিকে ঝুঁকেছিলেন, ফলে সোনার দাম বেড়েছিল। কিন্তু বর্তমানে মার্কিন প্রশাসনের মনোভাব অনেকটাই নমনীয় হয়েছে এবং চীনের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছানো গেছে।

নতুন চুক্তি অনুযায়ী, আমেরিকা চীনের নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের উপর বসানো ১৪৫ শতাংশ শুল্ক এক ধাক্কায় কমিয়ে ৩০ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। এর পাল্টা হিসেবে চীনও আমেরিকার পণ্যের উপর ১২৫ শতাংশ থেকে শুল্ক কমিয়ে ১০ শতাংশ করেছে। বিশ্বের এই দুই বৃহত্তম অর্থনীতির মধ্যে বাণিজ্যিক উত্তেজনা প্রশমিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে আশার আলো দেখা গেছে, যা সোনার মতো নিরাপদ সম্পদের আবেদন কমিয়ে দিয়েছে।

আন্তর্জাতিক চাহিদা কমার ক্ষেত্রে আরও কিছু বিষয় ভূমিকা রেখেছে। চীনের মতো সোনার অন্যতম বৃহৎ ক্রেতা দেশে সম্প্রতি ছুটির মরশুম থাকায় সেখানে সোনার চাহিদা সাময়িকভাবে কমেছে। অন্যদিকে, ভারতে বর্তমানে বিয়ের মরশুম চললেও, সোনার দাম কমার এই প্রবণতা দেখে অনেক ক্রেতাই দাম আরও কমার আশায় কেনা পিছিয়ে দিচ্ছেন। ফলে বাজারে সোনার চাহিদা প্রত্যাশিতভাবে বাড়েনি, যা দামকে প্রভাবিত করছে।

সামগ্রিকভাবে গ্লোবাল ইকনমিতে এখন একটি আশাবাদী পরিবেশ বিরাজ করছে। বিশ্বের অধিকাংশ শেয়ার বাজারে এখন চাঙ্গা ভাব দেখা যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক অস্থিরতা বা সংকটের সময়ে সাধারণত সোনার দাম বাড়ে কারণ এটি তখন বিনিয়োগকারীদের কাছে নিরাপদ আশ্রয় হয়। কিন্তু বর্তমানে সেই অস্থিরতা কিছুটা কমায় সোনার উপর থেকে চাহিদা কমেছে।

এছাড়াও, মার্কিন ডলারের শক্তিশালী অবস্থানও সোনার দাম কমতে সাহায্য করছে। বর্তমানে আমেরিকান ডলার ইনডেক্স ১০০-এর উপরে অবস্থান করছে, যা গত তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। যেহেতু আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম মার্কিন ডলারে নির্ধারিত হয়, তাই ডলার শক্তিশালী হলে অন্য মুদ্রার ক্রেতাদের জন্য সোনা কেনা ব্যয়বহুল হয়ে যায়, ফলে চাহিদা কমে এবং দাম পড়ে।

বাজার বিশেষজ্ঞরা বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বলছেন যে সোনার দাম আরও কমতে পারে। মাল্টি কমোডিটি এক্সচেঞ্জ (MCX) এবং ভারতের ঘরোয়া বাজারে সোনার বিক্রি বেড়েছে, যা দামকে আরও নিচের দিকে ঠেলছে। অনেক বাজার বিশেষজ্ঞের মতে, যদি বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন করে কোনো বড় সংকট বা অস্থিরতা দেখা না দেয়, তাহলে সোনার দাম হয়তো ৯০,০০০ টাকার নিচেও নেমে যেতে পারে। তবে, সোনার দামের ভবিষ্যৎ গতিপথ সম্পূর্ণভাবে বিশ্ব অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি এবং ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার উপর নির্ভর করবে। বর্তমান প্রবণতা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে আগামী দিনগুলোতে সোনার বাজার বিনিয়োগকারীদের জন্য নতুন সুযোগ নিয়ে আসতে পারে।