“অতীতে কম করে ৭ বার..”- বাংলাদেশে আওয়ামী লিগ নিষিদ্ধ হওয়া নতুন কোনো ঘটনা নয়

২০২৫ সালে এসে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক নাটকীয় পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে সদ্য ঘোষণা করা হয়েছে যে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল, বাংলাদেশ আওয়ামী লিগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ‘স্থগিত’ থাকবে। এটিকে কার্যত দলটির উপর একটি রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা হিসেবেই দেখছেন অনেকে।

আপাতদৃষ্টিতে আকস্মিক মনে হলেও, বাংলাদেশের প্রায় সাত দশকের রাজনৈতিক ইতিহাসে আওয়ামী লিগের জন্য এমন পরিস্থিতি নতুন নয়। এই সুদীর্ঘ সময়ে দলটি কমপক্ষে সাতবার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নিষিদ্ধ, দমন বা নিষ্ক্রিয়তার শিকার হয়েছে। তবে বিস্ময়করভাবে, প্রতিবারই প্রতিকূলতা জয় করে তারা ফিরে এসেছে দেশের রাজনীতিতে। এই ধারা কি ২০২৫ সালেও বজায় থাকবে, নাকি ইতিহাসের গতিপথ এবার ভিন্ন হবে, সেই প্রশ্নই এখন সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক। আওয়ামী লিগের ওপর বারবার আঘাত আসা এবং সেখান থেকে তাদের ঘুরে দাঁড়ানোর এই ঐতিহাসিক পরিক্রমা বিশেষভাবে বিশ্লেষণের দাবি রাখে।

১. ১৯৫৮: প্রথম সামরিক শাসন ও প্রথম নিষেধাজ্ঞা

পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী প্রধান জেনারেল আইয়ুব খান যখন ১৯৫৮ সালে ক্ষমতা দখল করে দেশে প্রথম সামরিক শাসন জারি করেন, তখন এর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল পূর্ব পাকিস্তানের উদীয়মান রাজনৈতিক শক্তিকে দমন করা। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং স্বায়ত্তশাসনের দাবিই এই সামরিক হস্তক্ষেপের প্রেক্ষাপট তৈরি করেছিল। সামরিক শাসন জারির সঙ্গে সঙ্গেই পাকিস্তান সরকার আওয়ামী লিগসহ সকল রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। দলের তৎকালীন শীর্ষস্থানীয় নেতা এবং পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী গ্রেফতার হন। দলের তরুণ ও প্রভাবশালী নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকেও বারবার আটক করা হয়। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের দাবি তোলা সেসময় ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ কার্যকলাপ হিসেবে গণ্য হতো, যা আওয়ামী লিগের মতো একটি গণতান্ত্রিক দলের জন্য ছিল এক চরম প্রতিকূল পরিস্থিতি।

২. ১৯৬৬–৭১: ছয় দফা আন্দোলন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা ও দলীয় নিষ্ক্রিয়তা

১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের মুক্তি সনদ খ্যাত ছয় দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন। এই কর্মসূচি পূর্ব পাকিস্তানের জন্য পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দাবি করেছিল, যা তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর কাছে ছিল স্বাধীনতার নামান্তর। ছয় দফার প্রতি জনগণের ব্যাপক সমর্থন দেখে ভীত হয়ে পাকিস্তান সরকার শেখ মুজিবকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেওয়ার গভীর ষড়যন্ত্র করে। এর ফলস্বরূপ, ১৯৬৮ সালে তাঁর বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করা হয়, যেখানে তাঁকে ভারতের সহায়তায় পাকিস্তান ভাঙার ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ ষড়যন্ত্রের প্রধান অভিযুক্ত করা হয়। এই মামলা চলাকালীন শেখ মুজিব ও আওয়ামী লিগের বহু নেতাকে কারাগারে বন্দি করা হয়। যদিও ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের মুখে পাকিস্তান সরকার মামলা প্রত্যাহার করতে এবং শেখ মুজিবকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়, তবুও এই পুরো সময়পর্বে আওয়ামী লিগ সাংগঠনিকভাবে প্রচণ্ড চাপের মুখে ছিল এবং দলের বহু নেতা-কর্মী তখনও বন্দি ছিলেন, ফলে দলটি কার্যত নিষ্ক্রিয় অবস্থায় ছিল।

৩. ১৯৭৫: বঙ্গবন্ধু হত্যার পর গভীর সংকট ও নিষ্ক্রিয়তা

বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে মর্মান্তিক অধ্যায় রচিত হয় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট, যখন সেনাবাহিনীর একদল বিপথগামী সদস্য ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে নির্মমভাবে হত্যা করে। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট সম্পূর্ণ পাল্টে যায়। আওয়ামী লিগের শীর্ষ নেতৃত্ব হারানোয় দলটি দিশেহারা হয়ে পড়ে এবং প্রকাশ্যে কোনও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান এবং পরবর্তীকালে জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনামলে দলটি আরও প্রান্তিক হয়ে পড়ে। এই দীর্ঘ সময়ে আওয়ামী লিগের অস্তিত্ব গভীর সংকটের মুখে পড়ে। দলের সভানেত্রী শেখ হাসিনা এ সময় তাঁর বোন শেখ রেহানাসহ বিদেশে নির্বাসিত জীবনযাপন করছিলেন, যা দলকে নেতৃত্বশূন্যতার চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেয়।

৪. ১৯৮২–৯০: এরশাদ শাসনে দমন ও শেখ হাসিনার গৃহবন্দিত্ব

১৯৮২ সালে তৎকালীন সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সামরিক আইন জারির মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেন। যদিও এরশাদ শাসনামলে আওয়ামী লিগকে আনুষ্ঠানিকভাবে সরাসরি নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়নি, তবে বিরোধী রাজনৈতিক কার্যকলাপকে কঠোর হাতে দমন করা হয়। জেনারেল এরশাদের সামরিক ও পরবর্তীকালে বেসামরিক শাসনামলে আওয়ামী লিগকে রাজপথে আন্দোলন করতে গিয়ে তীব্র দমন-পীড়নের শিকার হতে হয়। দলের প্রধান শেখ হাসিনাকে বহুবার গৃহবন্দি করে রাখা হয়, সভা-সমাবেশ আয়োজনের অনুমতি দেওয়া হতো না বা সেগুলোতে বাধা দেওয়া হতো। দলের অগণিত কর্মী ও নেতাকে গ্রেফতার, নির্যাতন এবং হয়রানির শিকার হতে হয়েছে এই সময়ে। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে আওয়ামী লিগ এই প্রতিকূলতার মধ্যেই নিজেদের সংগঠিত রাখার চেষ্টা করে।

৫. ২০০১–২০০৬: বিএনপি-জামায়াত শাসনে ‘টার্গেটেড অ্যাটাক’

২০০১ সালের সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার গঠন করার পর আওয়ামী লিগের ওপর নতুন ধরনের আঘাত নেমে আসে। এই সময়টিকে অনেকে ‘টার্গেটেড অ্যাটাক’ বা সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আক্রমণ হিসেবে বর্ণনা করেন। দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লিগের নেতা-কর্মীদের উপর ধারাবাহিক হামলা, মামলা এবং হয়রানি চালানো হয়। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরমে ওঠে। এই সময়ের সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা ছিল ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঢাকার বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লিগের একটি জনসভায় গ্রেনেড হামলা। তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী এবং আওয়ামী লিগের সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়, যাতে দলের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক আইভি রহমানসহ ২৪ জন নেতা-কর্মী নিহত এবং শত শত আহত হন। এই হামলার পর আওয়ামী লিগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয় এবং দলকে এক চরম আতঙ্কের পরিবেশের মধ্যে সাংগঠনিক কার্যক্রম চালাতে হয়।

৬. ২০০৭–২০০৮: সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারে ‘মাইনাস টু’ পরিকল্পনা

২০০৭ সালের শুরুতে দেশে রাজনৈতিক সংকট গভীর হলে একটি সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে। এই সরকারের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করা। তবে এই সরকারের আমলে একটি ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলার কথা শোনা যায়, যার উদ্দেশ্য ছিল দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লিগ ও বিএনপির শীর্ষ দুই নেত্রী শেখ হাসিনা এবং খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে ‘সরিয়ে দেওয়া’। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে শেখ হাসিনাকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়। দলের অনেক সিনিয়র নেতাও আটক হন। এই সময় আওয়ামী লিগের স্বাভাবিক রাজনৈতিক কার্যকলাপ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। তবে, শেখ হাসিনার গ্রেফতারের প্রতিবাদে দেশজুড়ে প্রবল জনচাপ সৃষ্টি হয় এবং আন্তর্জাতিক মহল থেকেও তার মুক্তির জন্য আহ্বান জানানো হয়। শেষ পর্যন্ত প্রবল চাপের মুখে তত্ত্বাবধায়ক সরকার শেখ হাসিনাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়, যা পরবর্তীকালে ২০০৮ সালের নির্বাচনের পথ খুলে দেয়।

৭. ২০২৫: ফের নিষেধাজ্ঞা ও শেখ হাসিনার ভারতে আশ্রয়

সবশেষ আঘাতটি আসে ২০২৫ সালে, যদিও এর প্রেক্ষাপট তৈরি হয় ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। সেই নির্বাচন ঘিরে সৃষ্ট ব্যাপক সহিংসতা, তীব্র রাজনৈতিক বিভাজন এবং পরবর্তীতে সেনা হস্তক্ষেপের প্রেক্ষাপটে গঠিত হয় অন্তর্বর্তী সরকার। এই সরকারের অন্যতম প্রথম পদক্ষেপ ছিল ২০২৪ সালের নির্বাচন বাতিল ঘোষণা করা, জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত করা এবং আওয়ামী লিগসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ড ‘স্থগিত’ ঘোষণা করা। এটি কার্যত আওয়ামী লিগের উপর আরেকটি রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞার সমতুল্য। দলটির প্রধান কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। এমন পরিস্থিতিতে দলের সভানেত্রী শেখ হাসিনা বর্তমানে প্রতিবেশী দেশ ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয়ে অবস্থান করছেন। দলের অনেক সিনিয়র ও গুরুত্বপূর্ণ নেতাকে গ্রেফতার করা হয়েছে, আবার অনেকেই আত্মগোপনে চলে গেছেন। দলটি আবারও এক কঠিন সাংগঠনিক ও অস্তিত্বের সংকটের মুখে পড়েছে।

ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি বনাম নতুন গতিপথ

আওয়ামী লিগের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রতিবারই চরম দমন-পীড়ন ও নিষেধাজ্ঞার শিকার হলেও দলটি কোনো না কোনো ভাবে আবার বাংলাদেশের রাজনীতিতে স্বমহিমায় ফিরে এসেছে। জনগণের সমর্থন, ত্যাগী নেতা-কর্মীদের প্রচেষ্টা এবং বঙ্গবন্ধুর আদর্শই হয়তো দলটিকে বার বার ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি যুগিয়েছে।

তবে এখন প্রশ্ন উঠেছে, ২০২৫ সালের এই পরিস্থিতি কি অতীতের মতোই আওয়ামী লিগের জন্য প্রত্যাবর্তনের আরও একটি অধ্যায় রচনা করবে? নাকি এবার ইতিহাস ভিন্ন পথে মোড় নেবে? বর্তমান প্রেক্ষাপট কি পূর্বের চেয়ে ভিন্নতর? নেতা-কর্মীদের অবস্থা, সাংগঠনিক কাঠামো এবং দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি অতীতের চ্যালেঞ্জগুলোর চেয়ে কতটা আলাদা? সময়ই এই প্রশ্নগুলোর চূড়ান্ত উত্তর দেবে। কিন্তু আওয়ামী লিগের সুদীর্ঘ ইতিহাস এটাই প্রমাণ করে যে, অস্তিত্বের সংকট দলটির জন্য নতুন নয়, তবে কঠিন পরিস্থিতি থেকে ফিনিক্স পাখির মতো জেগে ওঠার ক্ষমতাও এই দলটির ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।