জাস্টিস পেলাম, ‘আমার কপালের সিঁদুর যারা কেড়েছে তারা শাস্তি পাক’- কান্নায় ভেঙে পড়লেন বিতান অধিকারীর স্ত্রী!

ভূস্বর্গ কাশ্মীরে বেড়াতে গিয়ে নৃশংস জঙ্গি হামলার শিকার হয়েছিলেন কলকাতার বাঙালি পর্যটক বিতান অধিকারী। স্ত্রী ও সাড়ে ৩ বছরের ছেলেকে নিয়ে কাশ্মীরে বেড়াতে গেছিলেন বিতান। বৈসরনের সেই বর্বরোচিত হামলায় বেছে বেছে হিন্দু পর্যটকদের নিধন করেছিল জঙ্গিরা, মহিলাদের সিঁথির সিঁদুর দেখে হত্যা করেছিল স্বামীদের। সেই নারকীয় হত্যাকাণ্ডের ঠিক ১৫ দিনের মাথায় রক্তক্ষয়ী প্রতিশোধ নিল ভারত। গভীর রাতে ‘অপারেশন সিঁদুর’ (Operation Sindoor) নামে পাকিস্তানের ভেতরে ও পাক অধিকৃত কাশ্মীরে জঙ্গি ঘাঁটি গুঁড়িয়ে দিল ভারতীয় বায়ুসেনা। এই হামলায় প্রায় ৯০ জন জঙ্গি নিহত হয়েছে বলে অনুমান করা হচ্ছে। এই খবর পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন নিহত বাঙালি পর্যটক বিতান অধিকারীর স্ত্রী সোহিনী অধিকারী।
কলকাতার বাসিন্দা বিতান অধিকারী তাঁর স্ত্রী সোহিনী ও সাড়ে ৩ বছরের ছেলেকে নিয়ে কাশ্মীরে বেড়াতে গিয়েছিলেন। বৈসরনের ‘মিনি সুইৎজারল্যান্ড’-এ তাঁদের উপর হামলা চালায় জঙ্গিরা। প্রত্যক্ষদর্শী ও বেঁচে যাওয়া স্বজনহারারা অভিযোগ করেছিলেন, জঙ্গিরা সেখানে ধর্মীয় পরিচয় নিশ্চিত করে বেছে বেছে হিন্দু পুরুষদের খুন করেছে। নিরস্ত্র পর্যটকদের স্ত্রী, সন্তানদের সামনে নির্মমভাবে গুলি করে মারা হয়েছিল। মহিলাদের মাথায় সিঁদুর দেখে তাঁদের স্বামীদের নিশানা করেছিল জঙ্গিরা। নিহত ২৬ জন নিরীহ মানুষের মধ্যে অনেকে ছিলেন সদ্য বিবাহিত, যাঁদের মধুচন্দ্রিমায় গিয়ে এমন মর্মান্তিক পরিণতি হয়। হিমাংশী নরওয়ালের উপত্যকার মাঝে স্বামীর নিথর দেহ আঁকড়ে বসে থাকার হৃদয়বিদারক ছবি গোটা ভারতবাসীর মনে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছিল।
সেই নারকীয় হত্যাকাণ্ডের যোগ্য বদলা নিতেই এই সামরিক অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছে ‘অপারেশন সিঁদুর’। পহেলগাঁও হামলায় জঙ্গিরা যে ভাবে হিন্দু মহিলাদের সিঁদুরকে বিবাহের চিহ্ন হিসেবে দেখে স্বামীদের হত্যা করেছিল, সেই ঘটনার সাথে মিলিয়ে এই নামটি রাখা হয়েছে। এই নামকরণ করেছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এই নামের মাধ্যমে নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা ও তাদের পরিবারের প্রতি সংহতি প্রকাশ করা হয়েছে।
ভারতের প্রত্যাঘাতের খবর পেয়ে নিহত বাঙালি পর্যটক বিতান অধিকারীর স্ত্রী সোহিনী অধিকারী আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন এবং কান্নায় ভেঙে পড়েন। এবিপি আনন্দকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমাদের একটাই দাবি ছিল আমাদের জাস্টিস চাই। আর যেটা চেয়েছিলাম ভারত সরকার সেই অ্যাকশন নিয়েছে। মোদি সরকারের উপর সম্পূর্ণ ভরসা রয়েছে। আমার স্বামী নিশ্চয়ই এটা দেখছে উপর থেকে। আমার সিঁদুর যারা কেড়েছে তাঁরা শাস্তি পাক। আমার স্বামী যেখানে আছে শান্তি পাক এবার। ভবিষ্যতে যেন কারও কপালের সিঁদুর না মোছে। সরকারের কাছে আমার অনুরোধ রইল।’ তাঁর এই বক্তব্য নিহতদের পরিবারের গভীর আবেগ এবং ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষাকে তুলে ধরে।
পহেলগাঁও হামলার ১৫ দিনের মাথায় অর্থাৎ মঙ্গলবার মধ্যরাত পেরিয়ে যাওয়ার পরে ভারতীয় বায়ুসেনা এই আঘাত হানে। দূর থেকে আক্রমণ শানিয়ে ধ্বংসের মাত্রা বাড়াতে এই অভিযানে রাফাল যুদ্ধবিমানের পাশাপাশি সুখোই ও জাগুয়ার বিমান ব্যবহার করা হয়েছে। শক্তিশালী বাঙ্কার, কংক্রিটের বহুতল এক মুহূর্তে গুঁড়িয়ে দিতে সক্ষম ‘হ্যামার স্মার্ট বম্ব’ ব্যবহার করা হয়েছে প্রত্যাঘাতে। ৫০ থেকে ৭০ কিলোমিটার দূরে ছোড়া যায় এই স্মার্ট বম্বকে। জানা গেছে, পুরো অপারেশনটি সম্পন্ন করতে মাত্র ২৫ মিনিট সময় লেগেছে।
ভারতীয় বায়ুসেনার এই অতর্কিত বিমান হামলায় পাক অধিকৃত কাশ্মীর এবং পাকিস্তানের ভেতরে মোট ৯টি জঙ্গি ঘাঁটি সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। এই হামলায় প্রায় ৯০ জন জঙ্গি নিহত হয়েছে বলে গোয়েন্দা সূত্রে অনুমান করা হচ্ছে। এটি যদি সঠিক হয়, তবে এটি একটি অত্যন্ত বড় সাফল্য। ধ্বংস হওয়া ঘাঁটিগুলির মধ্যে বাহাওয়ালপুরে মাসুদ আজহারের জইশ-ই-মহম্মদের সদর দফতর এবং পাক অধিকৃত কাশ্মীরের মুজাফফরবাদে হিজবুল মুজাহিদিনের হেড কোয়ার্টার বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। স্থানীয় সূত্রে দাবি করা হচ্ছে, কোটলির একটি পুরোনো জঙ্গি ঘাঁটিতে হামলায় অন্তত ৩০ জন হিজবুল জঙ্গির মৃত্যু হয়েছে। গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, হামলার আগে বাহাওয়ালপুরের ঘাঁটিতে ২৫০ জন, মুরিদকেতে ১২০ জন এবং মুজাফ্ফরাবাদ ও কোটলিতে প্রায় ২০০ জন জঙ্গি ছিল। শিয়ালকোট, গুলপুর, ভীমবের ও চক আমরুর ঘাঁটিগুলোতে হামলার সময় ৩০০ জনের বেশি জঙ্গি ছিল বলে অনুমান।
পহেলগাঁওয়ের বর্বরতার জবাব হিসেবে ‘অপারেশন সিঁদুর’ কেবল একটি সামরিক অভিযান নয়, এটি নিহত ২৬ জন নিরীহ মানুষের প্রতি, বিশেষ করে ধর্মীয় বিদ্বেষের শিকার হওয়া হিন্দু পুরুষদের প্রতি এবং তাঁদের স্বামীহারা স্ত্রীদের প্রতি ভারতের গভীর শ্রদ্ধা ও ন্যায়বিচারের প্রতিশ্রুতি। এই অভিযানের নামকরণ এবং এর execution প্রমাণ করে ভারত সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কতটা সিরিয়াস। বিতান অধিকারীর স্ত্রী সোহিনী অধিকারীর আবেগঘন আবেদন এটাই স্পষ্ট করে যে, এই পদক্ষেপ নিহতদের পরিবারকে কিছুটা শান্তি দিয়েছে, কিন্তু সন্ত্রাসবাদের সমূল বিনাশ না হওয়া পর্যন্ত তাদের লড়াই চলবে।