সাংবাদিক বৈঠকে ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর অন্তরালের কাহিনি! উদ্দেশ্য-প্রমাণ দিলেন দুই মহিলা আধিকারিক ও বিদেশ সচিব

জম্মু ও কাশ্মীরের পহেলগাঁও-এ বর্বরোচিত জঙ্গি হামলার যোগ্য জবাব দিতে বুধবার গভীর রাতে পাকিস্তান এবং পাক অধিকৃত কাশ্মীরের ৯টি জঙ্গি ঘাঁটিতে সফলভাবে হামলা চালিয়েছে ভারত। ‘অপারেশন সিঁদুর’ নামে পরিচিত এই সামরিক অভিযান নিয়ে সকাল সাড়ে ১০টায় একটি সাংবাদিক বৈঠক করে ভারতীয় সেনা। বৈঠকে বিদেশসচিব বিক্রম মিস্রী উপস্থিত হয়ে হামলার প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করেন এবং দুই মহিলা সেনাকর্তা গুঁড়িয়ে দেওয়া নির্দিষ্ট জঙ্গি আস্তানাগুলির তালিকা ও প্রমাণ তুলে ধরেন। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপে ভারত যে জিরো টলারেন্স নীতি মেনে চলে, তা আবারও প্রমাণিত হলো।
বৈঠকের শুরুতে ২০০১ সালে সংসদে হামলা, ২০০৮ সালে মুম্বই হামলার মতো নানা ঘটনার ভিডিও ফুটেজ দেখানো হয়। এরপর বিদেশসচিব বিক্রম মিস্রী হামলার প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করে বলেন, “মুম্বই হামলার পর পহেলগাঁওয়ের ঘটনা সবচেয়ে বড় জঙ্গি হামলা। পরিবারের সামনে পুরুষদের মাথায় গুলি করে মারা হয়েছে। জম্মু ও কাশ্মীরে ফিরে আসা স্বাভাবিক পরিস্থিতিকে নষ্ট করার লক্ষ্যেই এই আক্রমণটি করা হয়েছিল। বিশেষ করে, অর্থনীতির মূল ভিত্তিকে নষ্ট করার জন্যই এই হামলা।”
তিনি জানান, জঙ্গি সংগঠন টিআরএফ হামলার দায় স্বীকার করেছে, যারা মূলত জইশ, লশকরের মতো বড় গোষ্ঠীর হয়ে ছোট সংগঠনের মাধ্যমে কাজ করে। পহেলগাঁওয়ের হামলার পর দেশের নানা প্রান্তে ক্ষোভ দেখা দিয়েছিল, তার পর ভারত সরকার কিছু পদক্ষেপও করেছিল। কিন্তু পহেলগাঁওয়ের জন্য ন্যায়বিচার আবশ্যক ছিল। এর পরেও পাকিস্তান সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপ করেনি, উল্টে ঘটনার সঙ্গে যোগাযোগ অস্বীকার করছে। ভারতের বিরুদ্ধে আগামী দিনেও হামলা হতে পারে এমন খবর আমাদের কাছে ছিল, তাই এই প্রত্যাঘাত আবশ্যক ছিল। এই হামলা সন্ত্রাসবাদের কাঠামোকে ধ্বংস করার জন্যই চালানো হয়েছে। রাষ্ট্রপুঞ্জ গত ২৫ এপ্রিল পহেলগাঁওয়ের হামলার নিন্দা করে বলেছিল ন্যায়বিচার দরকার, ভারতের প্রত্যাঘাত তার ভিত্তিতেই।
বিক্রম মিস্রী জোর দিয়ে বলেন, ইনটেলিজেন্সের তরফে ঘটনার সম্পূর্ণ ছবি স্পষ্ট করা হয়েছিল হামলার পর। রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট নিয়ে তথ্য দেন তিনি। জানান, এই ছোট জঙ্গি গোষ্ঠী সম্পর্কে খবর ছিল ভারতের ইন্টেলিজেন্সের কাছে, এনিয়ে রিপোর্টও দিল্লির তরফে দেওয়া হয়েছে। ডিসেম্বর ২০২৩-এ টিআরএফ নিয়ে সচেতন করেছিল ভারত, জানানো হয়েছিল এদের দিয়ে জঙ্গি কার্যকলাপ চালাচ্ছে লস্কর ও জইশের মতো বড় সংগঠন। ইউএস সিকিওরিটি কাউন্সিল এটা নিয়ে আলোচনাও করেছিল। তারপরই এমন ঘটনা। বিদেশ সচিবের বক্তব্য, এখন এটা স্পষ্ট যে পাকিস্তান জঙ্গিদের আশ্রয়স্থল। বিশ্বজুড়ে তারা এই ধরনের জঙ্গিদের আশ্রয় দিয়ে আসছে বহুদিন ধরে। এনিয়ে আর কোনও সন্দেহ নেই।
বিদেশ সচিবের বক্তব্যের পরই অপারেশন সিঁদুরের বর্ণনা দেওয়া শুরু করেন কর্নেল সোফিয়া কুরেশি এবং উইং কমান্ডার ব্যোমিকা সিংহ। সাংবাদিক বৈঠকে দুই মহিলা অফিসারের নির্বাচন যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ ছিল, যা সামরিক ক্ষেত্রে মহিলাদের গুরুত্বকে তুলে ধরে। তাঁরা বলেন, “পাকিস্তানে মোট ন’টি ঘাঁটিকে নিশানা করা হয়েছে। সেগুলিকে পুরো গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।” প্রযুক্তি ব্যবহার করে অত্যন্ত নির্ভুলভাবে এই জঙ্গি ঘাঁটিগুলিকে ধ্বংস করা হয়েছে। কোনও সাধারণ নাগরিকে ক্ষতি করা হয়নি। পাক সেনাঘাঁটিতেও হামলা করা হয়নি।
তালিকা প্রকাশ করে দুই সেনা আধিকারিক দেখান কোথায় কেন হামলা চালানো হয়েছে। তালিকা অনুযায়ী, প্রথম নিশানা ছিল শুভান আল্লাহ মসজিদ, সেখানে লস্কর-ই-তইবার ঘাঁটি এবং প্রশিক্ষণকেন্দ্র রয়েছে। বিলাল মসজিদে ছিল জইশ-ই-মহম্মদের প্রশিক্ষণকেন্দ্র। কোটলির মসজিদে ছিল লস্করের ঘাঁটি। এগুলি সবই ছিল পাক অধিকৃত কাশ্মীরে। এছাড়াও পাকিস্তানের শিয়ালকোটে, মেহমুনা জোয়া ক্যাম্পে হামলা চালানো হয়েছে। মেহমুনাতে হিজবুলের ক্যাম্প ছিল, এখান থেকেই পাঠানকোটে হামলা হয়েছিল। মুরদিকের মারকাজ তইবায় হামলা করা হয়েছে, এখানেই ২৬/১১-এর জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। যে ক’টি ঘাঁটিতে হামলা চালানো হয়েছে সেগুলির প্রতিটির ছবি দেখানো হয় সাংবাদিক বৈঠকে।
গোয়েন্দা সূত্রে খবর, এই হামলায় প্রায় ৮০ থেকে ৯০ জন জঙ্গি নিহত হয়েছে। যদিও সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে হতাহতের আনুষ্ঠানিক সংখ্যা এখনো জানানো হয়নি। সমস্ত ভারতীয় বিমানচালক নিরাপদে ফিরে এসেছেন বলে বায়ুসেনার তরফে জানানো হয়েছে। তবে ভারতীয় সেনার এই অভিযানের পরই পাকিস্তান নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর পাল্টা গুলিবর্ষণ শুরু করে, যাতে পুঞ্চ অঞ্চলে ৩ জন ভারতীয় নাগরিক শহিদ হয়েছেন, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।
‘অপারেশন সিঁদুর’ এবং সকালের সাংবাদিক বৈঠক সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ভারতের দৃঢ় মনোভাবকে আরও একবার স্পষ্ট করে দিল। বিদেশ সচিবের ব্যাখ্যা পাকিস্তানের সন্ত্রাসবাদের আশ্রয়স্থল হিসেবে ভূমিকা এবং জঙ্গি গোষ্ঠীগুলির মধ্যে যোগাযোগকে সামনে এনেছে। পাশাপাশি, মহিলা সেনাকর্তাদের মাধ্যমে নির্দিষ্ট ঘাঁটিগুলির নাম, উদ্দেশ্য এবং তাদের পূর্ববর্তী হামলার সঙ্গে যোগসূত্র তুলে ধরা এই অভিযানের স্বচ্ছতা ও যৌক্তিকতা প্রমাণ করে। এই পদক্ষেপ যেমন দেশের মানুষের মনে স্বস্তি এনেছে, তেমনই ভবিষ্যতে সন্ত্রাসবাদের মোকাবিলায় ভারতের সক্ষমতা ও ইচ্ছাকে তুলে ধরেছে। তবে, পাকিস্তানের পাল্টা হামলায় নিরীহ ভারতীয় নাগরিকদের মৃত্যু গভীর শোকের কারণ।