ভারত-পাকিস্তান বাণিজ্য সম্পর্ক ছিন্ন, কার কতটা ক্ষতি হচ্ছে?

বর্তমানে ভারত ও পাকিস্তানের সম্পর্ক সম্ভবত সবচেয়ে খারাপ সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। জম্মু ও কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ে নিরীহ পর্যটকদের উপর বর্বর জঙ্গি হামলার ঘটনা এই পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তুলেছে। পাকিস্তানকে কড়া বার্তা দিতে ভারত সরকার একের পর এক পদক্ষেপ নিচ্ছে, যার মধ্যে অন্যতম হল দুই দেশের মধ্যে থাকা সমস্ত অর্থনৈতিক সম্পর্ক, এমনকি বাণিজ্যিক লেনদেনও পুরোপুরি ছিন্ন করা।

সম্প্রতি ভারত সরকার ঘোষণা করেছে যে তারা পাকিস্তানের সঙ্গে সমস্ত ধরনের বাণিজ্যিক সম্পর্ক সম্পূর্ণভাবে স্থগিত রাখছে। এর ফলে দুই দেশের মধ্যে আমদানি-রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেল। এই পরিস্থিতিতে স্বভাবতই প্রশ্ন উঠছে: পাকিস্তানের সঙ্গে বাণিজ্য বন্ধ করে দেওয়ার ফলে ভারতের অর্থনীতিতে কতটা প্রভাব পড়বে? অতীতে ঠিক কী কী পণ্য দুই দেশের মধ্যে আদানপ্রদান হতো? এবং পাকিস্তান থেকে নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের আমদানি বন্ধ হয়ে গেলে ভারতে কি সেগুলির দাম বাড়তে পারে?

ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্পর্ক এমনিতেই দীর্ঘকাল ধরে অস্থির। ২০১৯ সালের পুলওয়ামা হামলার পর ভারত পাকিস্তানের সঙ্গে বাণিজ্যের উপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল, যার ফলে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরেও দুই দেশের মধ্যে মোট বাণিজ্য ছিল ৪,৩৭০ কোটি টাকার বেশি। কিন্তু ২০১৯ সালে পুলওয়ামা হামলার পর ভারত পাকিস্তান থেকে আমদানির উপর ২০০ শতাংশ শুল্ক চাপায়, যা বাণিজ্যে তীব্র ধাক্কা দেয়। ২০১৯-২০ অর্থবছরে আটারি স্থলবন্দর দিয়ে বাণিজ্য কমে প্রায় ২,৭৭২ কোটি টাকায় এসে দাঁড়ায়।

এই মুহূর্তে পাকিস্তান তাদের দুর্বল অর্থনীতির সাথে লড়াই করছে। মুদ্রাস্ফীতি রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে, বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার দ্রুত কমছে এবং দেশটি আন্তর্জাতিক মুদ্রা ভাণ্ডার (আইএমএফ)-এর ঋণের উপর চরমভাবে নির্ভরশীল। এমন কঠিন সময়ে ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্কের সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতা ভারতের চেয়ে পাকিস্তানের উপর অনেক বেশি প্রভাব ফেলবে বলেই মনে করা হচ্ছে।

বাণিজ্য পরিসংখ্যান এই অসম পরিস্থিতিকে স্পষ্ট করে দেয়। ২০২১-২২ অর্থবছরে ভারত যেখানে পাকিস্তানে ৫১৩.৮২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের পণ্য রপ্তানি করেছিল, সেখানে পাকিস্তান থেকে ভারতের আমদানি ছিল মাত্র ২.৫৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০২২-২৩ সালে ভারতে পাকিস্তানের রপ্তানি কিছুটা বেড়ে ২০.১১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার হলেও ভারতের রপ্তানি বেড়ে দাঁড়ায় ৬২৭.১০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। সর্বশেষ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে পাকিস্তান থেকে আমদানি আরও কমে মাত্র ২.৮৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যেখানে ভারতের রপ্তানি বিপুলভাবে বেড়ে ১,১৮০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে।

এই পরিসংখ্যান থেকে পরিষ্কার যে, পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের মোট বাণিজ্য ভারতের সামগ্রিক বাণিজ্যের ০.০৬% এরও কম। এর মানে হলো, ভারত পাকিস্তান থেকে আমদানির উপর একেবারেই নির্ভরশীল নয়। অন্যদিকে, পাকিস্তান ভারতের থেকে আমদানির উপর অনেক বেশি নির্ভর করে।

মূলত পাকিস্তান থেকে ভারতে আমদানি করা হতো তরমুজ, ফুটি, সিমেন্ট, শিলা লবণ, শুকনো ফল, পাথর, চুন, তুলো, ইস্পাত, চশমার সরঞ্জাম, জৈব রাসায়নিক, ধাতব যৌগ, চামড়ার জিনিস, তামা, সালফার, কাপড়, চপ্পল, মুলতানি মাটি ইত্যাদি। অন্যদিকে, ভারত থেকে পাকিস্তানে রপ্তানি হতো নারকেল, বিভিন্ন ধরনের ফল ও সবজি, চা, মশলা, চিনি, তৈলবীজ, পশুখাদ্য, দুগ্ধজাত পণ্য, প্লাস্টিকের জিনিস, ওষুধ, লবণ, মোটর গাড়ির যন্ত্রাংশ, রঞ্জক পদার্থ, কফি ইত্যাদি। বাণিজ্য সম্পূর্ণ বন্ধ হওয়ায় পাকিস্তানের এইসব পণ্যের আমদানির জন্য অন্য উৎস খুঁজতে হবে, যা তাদের ভঙ্গুর অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।