“ইচ্ছাকৃত ২০০ বারের বেশি সাপের কামড়..?”-ব্যক্তির রক্ত থেকে তৈরি হচ্ছে অ্যান্টিভেনম

ঘটনাটি অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্যি! এক ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে দু’শোরও বেশি বার সাপের কামড় খেয়েছেন এবং সাতশোর বেশি বার ইনজেকশনের মাধ্যমে নিজের শরীরে নিয়েছেন বিষ। যুক্তরাষ্ট্রের বাসিন্দা টিম ফ্রিড নামের এই সাহসী মানুষটি জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়ে এই কাজটি করেছেন একটি মহৎ বৈজ্ঞানিক লক্ষ্যের জন্য – সাপের বিষের বিরুদ্ধে কার্যকর একটি সর্বজনীন প্রতিষেধক বা অ্যান্টিভেনম তৈরি করা। তাঁর এই চরম প্রচেষ্টা বিজ্ঞানীদের গবেষণায় নতুন দুয়ার খুলে দিয়েছে।
একসময় ট্রাক মেকানিকের কাজ করা টিম ফ্রিডের নেশা হয়ে ওঠে সাপ নিয়ে কাজ করা। শুরুতে তিনি হয়তো নিজের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে চেয়েছিলেন যাতে সাপ ধরার সময় তিনি নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে পারেন। নিজের এই ভয়ঙ্কর কীর্তিকলাপ তিনি ভিডিও করে ইউটিউবে নথিবদ্ধ করে রাখতেন। তিনি বিশ্বের সবচেয়ে মারাত্মক কিছু সাপ, যেমন – একাধিক প্রজাতির মাম্বা, কোবরা, তাইপান এবং ক্রেইটের মতো বিষধর সাপ থেকে বিষ সংগ্রহ করে নিজের শরীরে প্রয়োগ করেছেন।
টিম ফ্রিডের এই প্রায় দুই দশকের আত্মঘাতী পর্যায়ের প্রচেষ্টার ফলস্বরূপ বিজ্ঞানীরা তাঁর রক্ত পরীক্ষা করে চমকপ্রদ তথ্য পেয়েছেন। তাঁরা টিম ফ্রিডের রক্তে এমন এক ধরনের অ্যান্টিবডি খুঁজে পেয়েছেন যা অত্যন্ত মারাত্মক সাপের বিষের বিরুদ্ধেও কাজ করতে পারে। এই অ্যান্টিবডি প্রাণীদের ওপর পরীক্ষা করে দেখা গেছে, এটি বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণীকে সাপের বিষের মারাত্মক ডোজ থেকে সুরক্ষা দিতে সক্ষম হয়েছে।
বর্তমানে সাপের বিষের চিকিৎসায় যে অ্যান্টিভেনম প্রচলিত আছে, তা সাধারণত নির্দিষ্ট প্রজাতির সাপের বিষ অনুযায়ী কাজ করে। অর্থাৎ, যে প্রজাতির সাপ কামড়েছে, ঠিক সেই প্রজাতির সাপের বিষ থেকে তৈরি অ্যান্টিভেনমই রোগীকে দিতে হয়। সমস্যা হলো, একই প্রজাতির সাপের মধ্যেও অঞ্চল ভেদে বিষের প্রকৃতিতে তারতম্য থাকে, ফলে এক অঞ্চলের অ্যান্টিভেনম অন্য অঞ্চলের সাপের কামড়ের বিরুদ্ধে কম কার্যকর হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, সাপের কামড়ে প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় ১ লক্ষ ৪০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয় এবং এর তিনগুণেরও বেশি মানুষ অঙ্গহানি বা স্থায়ী পঙ্গুত্বের শিকার হন।
টিম ফ্রিডের এই প্রচেষ্টা সাপের কামড়ের বিরুদ্ধে একটি সার্বজনীন অ্যান্টিভেনম তৈরির ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হতে পারে বলে বিজ্ঞানীরা আশা করছেন। যেখানে প্রচলিত পদ্ধতিতে ঘোড়ার মতো প্রাণীদের শরীরে সাপের বিষের ছোট ডোজ দিয়ে অ্যান্টিবডি তৈরি করানো হয় এবং তা বিষের সঙ্গে মিলিয়ে অ্যান্টিভেনম তৈরি করা হয় (কারণ বিষ ও অ্যান্টিভেনমকে একে অন্যের সঙ্গে মেলাতে হয়), সেখানে বিজ্ঞানীরা এমন এক ধরনের অ্যান্টিবডি খুঁজছিলেন যা বিষের নির্দিষ্ট অংশ নয়, বরং সব ধরনের বিষে থাকা সাধারণ অংশগুলোর বিরুদ্ধে কাজ করে – এই ধরনের অ্যান্টিবডিকে ‘ব্রডলি নিউট্রিলাইজিং অ্যান্টিবডি’ বলা হয়।
ঠিক এই সময়েই সেন্টিভ্যাক্স (Centivax) নামের একটি বায়োটেক কোম্পানির প্রধান নির্বাহী ড. জ্যাকব গ্লানভিল খোঁজ পান টিম ফ্রিডের। তিনি ভাবেন, বিশ্বে যদি কারোর শরীরে এমন ব্রডলি নিউট্রিলাইজিং অ্যান্টিবডি তৈরি হয়ে থাকে, তবে সেটা টিম ফ্রিডের শরীরেই সম্ভব। তিনি টিমের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং প্রথম ফোনেই বলেন, “বিষয়টা হয়তো অদ্ভুত শোনাবে, কিন্তু আপনার কিছু রক্ত পেলে খুব ভালো হতো।”
টিম ফ্রিড গবেষণার জন্য রক্ত দিতে রাজি হন। এই গবেষণাটি নৈতিক অনুমোদনও লাভ করে, কারণ এই প্রক্রিয়ায় টিমকে আর নতুন করে বিষ দেওয়া হয়নি, শুধুমাত্র তাঁর শরীর থেকে রক্ত সংগ্রহ করা হয়েছে পরীক্ষার জন্য। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে টিম ফ্রিডের এই আত্মত্যাগ যদি সাপের কামড়ের একটি কার্যকর ও সার্বজনীন চিকিৎসা পদ্ধতির উদ্ভাবনে সাহায্য করে, তবে তা বিশ্বজুড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন বাঁচানোর ক্ষেত্রে এক অসামান্য অবদান রাখবে। যদিও এসব শুরুর আগে গোখরার দুটি কামড় খেয়ে একবার কোমায় চলে গিয়েছিলেন তিনি, তবুও পিছপা হননি এই সাহসী মানুষটি। টিম বলেছেন, তাঁর লক্ষ্য ছিল বিশ্বের অন্যান্য মানুষের জন্য একটি উন্নত থেরাপি তৈরি করা।