কাঠমান্ডুতে বোনা হয় ষড়যন্ত্রের জাল, পাক এমব্যাসিতে বসেই করা হয় হামলার ছক?

১৯৯৯ সালে ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট আইসি ৮১৪ হাইজ্যাক করে কুখ্যাত জৈশ-ই-মহম্মদ নেতা মাসুদ আজহারকে ছাড়িয়ে নেওয়া হয়েছিল আফগানিস্তানের কান্দাহারে। এবার কাশ্মীরের পহেলগামে পর্যটকদের উপর ভয়ঙ্কর জঙ্গি হামলার পিছনেও কি সেই একই ছকের পুনরাবৃত্তি? ২৬/১১ মুম্বাই হামলার অন্যতম প্রধান চক্রী তাহাউর হুসেন রানাকে ছাড়িয়ে আনতেই কি পর্যটকদের পণবন্দি করার পরিকল্পনা করা হয়েছিল? চাঞ্চল্যকর গোয়েন্দা রিপোর্টে এমনই ভয়াবহ ইঙ্গিত মিলেছে। শুধু তাই নয়, গোয়েন্দা সূত্রে খবর, পহেলগাম হামলার নীল নকশা চূড়ান্ত করা হয়েছিল নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে, সেই একই শহরে যেখানে বসে কান্দাহার হাইজ্যাকের ছক তৈরি হয়েছিল!

গোয়েন্দা সূত্রে পাওয়া তথ্য আরও উদ্বেগজনক। জানা গেছে, পহেলগাম হামলার মূল পরিকল্পনা ও মিটিং কাঠমান্ডুতে অবস্থিত পাকিস্তানি দূতাবাসের অভ্যন্তরেই হয়েছিল। এই গোপন বৈঠকে শুধু শীর্ষ জঙ্গি নেতাই নন, হাজির ছিলেন পাক সেনা এবং আইএসআই-এর উচ্চপদস্থ অফিসারেরাও। লস্কর-ই-তৈবা এবং জৈশ-ই-মহম্মদ-এর শীর্ষ নেতৃত্বও সেখানে উপস্থিত ছিল।

গোয়েন্দারা নিশ্চিত হয়েছেন, এই বৈঠকে লস্করের গুরুত্বপূর্ণ নেতা সইফুল্লা কসৌরি এবং হামাস নেতা খালিদ আল কাদ্দুমির উপস্থিতি ছিল। তবে সবথেকে চাঞ্চল্যকর নাম ছিল রউফ আসগর। কে এই রউফ? সে কুখ্যাত মাসুদ আজহারের ভাই! সেই মাসুদ, যাকে ছাড়াতেই কান্দাহার হাইজ্যাক হয়েছিল। এছাড়া, ওই বৈঠকে লস্করের আসগর খান কাশ্মীরি ও মাসুদ ইলিয়াস নামে আরও দুই নেতার উপস্থিতির খবরও মিলেছে।

পহেলগাম হামলার পরেই গোয়েন্দাদের কাছে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়ে যায়: নানা কারণে একসময় দূরত্ব তৈরি হলেও, লস্কর এবং জৈশ ফের কাছাকাছি এসেছে। লস্করের শক্তি কিছুটা কমায় জৈশ আবার মাথাচাড়া দেওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু পাক সেনা ও আইএসআইয়ের নির্দেশ ছিল স্পষ্ট – এবার ভারতকে আঘাত করতে হলে দুই গোষ্ঠীকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। লস্কর এবং জৈশের নতুন প্রজন্মের দুই নেতা, সইফুল্লা এবং রউফের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে আসরে নামে হামাস নেতা কাদ্দুমি। এদের সবাইকে এক ছাতার তলায় এনে ভারতের বুকে সাম্প্রতিক অতীতে সবথেকে ভয়ঙ্কর জঙ্গি হামলার ব্লুপ্রিন্ট তৈরি শুরু হয়।

গোয়েন্দারা আরও নিশ্চিত হয়েছিলেন যে পাক-অধিকৃত কাশ্মীর (PoK)-এও এই সব পক্ষের একটি বৈঠক হয়েছে। সে সময়েও সইফুল্লা, রউফ এবং কাদ্দুমিকে PoK-তে দেখা গিয়েছিল। কাঠমান্ডুর খবর আসার পর তদন্তকারীরা হামলার বিভিন্ন দিক আরও ভালোভাবে বুঝতে পেরেছেন। জানা গেছে, হামলার প্রধান দুই জঙ্গি – হাশিম মুসা এবং আদিল হুসেন ঠোকর – আগে একাধিকবার সীমান্ত পেরিয়ে কাশ্মীরে যাতায়াত করলেও, বৈসরনে হামলার ঠিক দু’দিন আগেই সঙ্গীদের নিয়ে তারা ভারতের মাটিতে প্রবেশ করে।

প্রাথমিকভাবে জঙ্গিদের লক্ষ্য ছিল শ্রীনগরের লাল চক অথবা ডাল লেকের শিকারায় হামলা চালানো। কিন্তু গোয়েন্দা সূত্র বলছে, নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে সেই পরিকল্পনা বাতিল করতে বাধ্য হয় জঙ্গিরা। এরপর কাঠমান্ডুতেই চূড়ান্ত হয়ে যায় যে, তাদের মূল লক্ষ্য হবে পর্যটকেরা। তিনটি সম্ভাব্য পর্যটন স্পট বেছে নেওয়া হয়। উপত্যকায় পৌঁছে স্থানীয় কাশ্মীরি ওভার গ্রাউন্ড ওয়ার্কারদের (OGW) সাহায্যে জঙ্গিরা পহেলগামের অ্যামিউজমেন্ট পার্কে রেকি করতে যায়, কিন্তু সেখানে কড়া নিরাপত্তা দেখে পিছিয়ে আসে। এরপর তারা আরু ভ্যালি এবং বেতাব ভ্যালিতে গেলেও প্রচুর সংখ্যক সশস্ত্র জওয়ানের উপস্থিতি দেখে আক্রমণ না করার সিদ্ধান্ত নেয়।

তখনই OGW-দের একজন তাদের বৈসরনের কথা জানায়। বৈসরনে যাতায়াতের সুবিধা, ঢোকা ও পালানোর পথ, মোতায়েন বাহিনীর দূরত্ব, এমনকি রিসর্টের গেস্ট লিস্ট পর্যন্ত পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য OGW-রা জঙ্গিদের পৌঁছে দিয়েছিল বলে গোয়েন্দারা জানতে পেরেছেন। এই গোটা কাজে চারজন OGW যুক্ত ছিল। এই সব খবর পেতেই সীমান্তের ওপারে যোগাযোগ করা হয়। যেহেতু মুসা এবং আদিল পুরো এলাকা খুব ভালোভাবে চিনত, তাই তাদের তথ্যে সংশয় ছিল না। পাকিস্তান থেকে সবুজ সঙ্কেত আসতে দেরি হয়নি এবং তারপরই হামলা চালানো হয়।

এই হামলার চূড়ান্ত নির্দেশ কে দিয়েছিল? শুরুতে সইফুল্লার নাম এসেছিল, পরে লস্করের আরেক শীর্ষ কমান্ডার ফারুখ আহমেদের নাম দ্বিতীয় মাস্টারমাইন্ড হিসেবে উঠে আসে (যার বাড়ি ইতিমধ্যেই বাহিনী উড়িয়ে দিয়েছে)। তবে একেবারে শুরু থেকেই গোয়েন্দাদের সন্দেহের তালিকায় ছিলেন রউফ আসগর, মাসুদ আজহারের ভাই। PoK-তে হামাস ও লস্করের সঙ্গে তার উপস্থিতি সম্পর্কে গোয়েন্দারা নিশ্চিত ছিলেন, এবং এখন কাঠমান্ডুতেও তার নাম আসায় মাস্টারমাইন্ডদের লাইন-আপ অনেকটাই পরিষ্কার: লস্করের দিক থেকে সইফুল্লা ও ফারুখ, জৈশের দিক থেকে রউফ আসগর, এদের সঙ্গে হামাসের কাদ্দুমি এবং সবকিছুর পেছনে পাক সেনা ও আইএসআই।

অপারেশন চালানোর জন্য যে টিম তৈরি করা হয়েছিল, তাও ছিল খুব ভেবেচিন্তে নেওয়া সিদ্ধান্ত। কাশ্মীরে নাশকতা চালানোয় অভিজ্ঞ হাশিম মুসা এবং আদিল হুসেন ঠোকরের উপরেই হামলার ভার দেওয়া হয়েছিল। ২০২৪ সালে সোনমার্গের জেড-মোর টানেল প্রকল্পে এলোপাথাড়ি গুলি চালিয়ে ৯ জনকে হত্যা করেছিল জঙ্গিরা, সেই হামলার নেতৃত্ব দিয়েছিল মুসা, তার সঙ্গী ছিল আদিল। গত বছরও অন্তত তিনটি ছোট থেকে মাঝারি হামলায় এই মুসা-আদিল জুটি সক্রিয় ছিল। তাই বিশ্বস্ত এবং পরীক্ষিত এই জুটিকেই বেছে নিতে জঙ্গি নেতারা দ্বিধা করেনি। এই সিদ্ধান্তও কাঠমান্ডুতে বসেই চূড়ান্ত হয়েছিল বলে গোয়েন্দা সূত্রে খবর।

এই চাঞ্চল্যকর গোয়েন্দা রিপোর্ট পহেলগাম হামলার নেপথ্যের কাহিনি এবং তার আন্তর্জাতিক যোগসূত্র ও পাক মদতের বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে সামনে নিয়ে এসেছে।

Editor001
  • Editor001