বাবা-মা যাবজ্জীবন বন্দি, মাধ্যমিকে কৃতিত্ব দেখাল ছেলেরা!

জীবনের শুরুতেই এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছিল তারা। যখন সহপাঠীরা বাবা–মায়ের হাত ধরে স্কুলে যায়, তাদের মা–বাবা তখন যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত হয়ে কারান্তরালে। ভবিষ্যৎ নিয়ে যখন পরিবার পরিজন ও পড়শিদের কপালে চিন্তার ভাঁজ, তখনই আশার আলো দেখায় ব্যারাকপুর রামকৃষ্ণ বিবেকানন্দ মিশন আশ্রম। এই মিশনের স্নেহের ছায়ায় ও কঠোর অনুশাসনে থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষায় প্রথম সুযোগেই সফল হয়েছে দুই অনাথ পড়ুয়া। তাদের এই সাফল্যে স্বাভাবিকভাবেই খুশি মিশন কর্তৃপক্ষ।
এই দুই ছাত্রের মধ্যে একজন হুগলির খানাকুল এবং অন্যজন বীরভূমের মাড়গ্রামের বাসিন্দা। তাদের বাবা–মা বর্তমানে বর্ধমান কেন্দ্রীয় কারাগারে যাবজ্জীবন সাজা ভোগ করছেন। সাত বছর আগে বাবা–মা জেলে যাওয়ার পর তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে যখন অনিশ্চয়তা দেখা দেয়, তখন জেল কর্তৃপক্ষ ব্যারাকপুর রামকৃষ্ণ বিবেকানন্দ মিশন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। শিশুদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করার কথা ভেবে মিশন কর্তৃপক্ষ পঞ্চম শ্রেণি থেকে তাদের মিশনের হোস্টেলে আশ্রয় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
সেই থেকে গত সাত বছর ধরে এই দুই ছাত্র ব্যারাকপুর রামকৃষ্ণ বিবেকানন্দ মিশনের আবাসিক হিসেবেই পড়াশোনা করেছে। তাদের থাকা–খাওয়া, পড়াশোনা সহ যাবতীয় দায়িত্ব বহন করেছে মিশন কর্তৃপক্ষ। মিশনের শিক্ষকরা বিশেষ নজর রেখেছিলেন যাতে তারা প্রথম সুযোগেই মাধ্যমিকের বৈতরণী পার হতে পারে। তাদের সেই প্রচেষ্টা সফল হয়েছে। প্রকাশিত ফলাফল অনুযায়ী, একজন ছাত্র ৩৪৭ নম্বর পেয়ে বি প্লাস গ্রেড এবং অন্যজন ২৬২ নম্বর পেয়ে বি গ্রেড নিয়ে মাধ্যমিক উত্তীর্ণ হয়েছে।
পরীক্ষার নম্বরের দিক থেকে তারা হয়তো খুব উজ্জ্বল ফল করতে পারেনি, কিন্তু জীবনের এত বড় প্রতিকূলতাকে জয় করে প্রথম সুযোগেই মাধ্যমিক পাশ করা তাদের জন্য বিশাল সাফল্য বলেই মনে করছে স্কুল ও মিশন কর্তৃপক্ষ। মিশনের সম্পাদক স্বামী নিত্যরূপানন্দ মহারাজ বলেন, “আমাদের স্কুল থেকে ৬৯৭ নম্বর (সংশোধিত নম্বর, আগে ছিল ৬৮৩) পেয়ে প্রথম হওয়া আবির সাহার রেজাল্টে আমরা যেমন আনন্দিত, ঠিক ততটাই আনন্দিত এই দুই পড়ুয়ার সাফল্যে। বাবা–মা ছাড়া প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে প্রথম সুযোগেই মাধ্যমিক উত্তীর্ণ হওয়া তাদের লড়াকু মানসিকতারই প্রমাণ। এটি তাদের নিজস্ব জয়।”
মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর দুই ছাত্র আপাতত তাদের পরিবারের কাছে ফিরে গেছে। একজন তার দাদার বাড়িতে এবং অন্যজন মামার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। মিশন কর্তৃপক্ষ আশ্বাস দিয়েছেন যে, আগামী দিনে তারা যদি উচ্চশিক্ষা চালিয়ে যেতে চায় এবং তাদের কোনও সাহায্যের প্রয়োজন হয়, তবে মিশন তাদের পাশে থাকবে। এই ঘটনা প্রমাণ করে দিল, সঠিক আশ্রয়, ভালোবাসা এবং সুযোগ পেলে জীবনের কঠিনতম পরিস্থিতি থেকেও সাফল্য ছিনিয়ে আনা সম্ভব।