পৃথিবী থেকে চাঁদের অন্য পাশ দেখা যায় না কেন, জেনেনিন কি বলছে বিজ্ঞনীরা?

রাতের আকাশে বিশাল গোলাকার চাঁদ আমাদের অনেকের কাছেই এক অপার বিস্ময়। কৌতূহলের বিষয় হচ্ছে, আমরা হাজার হাজার বছর ধরে পৃথিবী থেকে চাঁদের শুধু এক পাশের ছবিই দেখে আসছি। আর তাই অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, পৃথিবী থেকে কেন চাঁদের পেছনে থাকা অন্য অংশ দেখা যায় না? বিজ্ঞানীরা এর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন। চাঁদের নিজস্ব গতিপ্রকৃতিই এর জন্য দায়ী।

বিজ্ঞানীদের তথ্যমতে, চাঁদ তার নিজ অক্ষের চারপাশে একবার সম্পূর্ণ ঘুরতে প্রায় ২৭ দশমিক ৩ দিন সময় নেয়। মজার বিষয় হলো, একই সময়ে পৃথিবীকে একবার প্রদক্ষিণ করতেও চাঁদের প্রায় একই সময় প্রয়োজন হয়। অর্থাৎ, চাঁদের নিজের অক্ষের চারপাশের ঘূর্ণনের সময়কাল এবং পৃথিবীকে প্রদক্ষিণের সময়কাল প্রায় হুবহু মিলে যাওয়ার কারণেই পৃথিবী থেকে আমরা সবসময় চাঁদের শুধু এক পাশের ছবিই দেখতে পাই।

কিন্তু কেন এই দুটি সময়কাল মিলে গেল? বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন, কোটি কোটি বছর আগে যখন চাঁদের বয়স কম ছিল, তখন এটি নিজের অক্ষের চারপাশে দ্রুতগতিতে ঘুরত। পৃথিবী তখন তার শক্তিশালী মহাকর্ষীয় টানের মাধ্যমে চাঁদের ওপর জোয়ার-ভাটার মতো প্রভাব সৃষ্টি করত। পৃথিবীর এই মহাকর্ষণ শক্তি চাঁদের কঠিন অংশে তেমন প্রভাব ফেলতে না পারলেও, চাঁদের ভেতরের তরল ম্যাগমা বা আংশিক গলিত অংশে প্রবল আলোড়ন তৈরি করত। এই জোয়ার-ভাটার ঘর্ষণের ফলে চাঁদের ঘূর্ণনের গতি ধীরে ধীরে কমতে থাকে। কালের পরিক্রমায় একসময় চাঁদের নিজের অক্ষের চারপাশের ঘূর্ণনের গতি তার পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করার গতির সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যায়। এই কারণেই চাঁদের একটি নির্দিষ্ট পাশ সব সময় পৃথিবীর দিকে মুখ করে থাকে। বিজ্ঞানীরা এই ঘটনাকে টাইডাল লকিং (Tidal Locking) বলে ব্যাখ্যা করেন।

পৃথিবীর বিপরীত দিকে থাকা চাঁদের অংশটি ‘চাঁদের অন্ধকার দিক’ (Dark Side of the Moon) নামে পরিচিত হলেও আসলে সেখানেও সূর্যের আলো পৌঁছায়। তবে পৃথিবীর দিক থেকে এটি সবসময়ই দৃষ্টির আড়ালে থাকে। ১৯৬০ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের লুনা–৩ মহাকাশযান প্রথমবার পৃথিবীর বিপরীত দিকে থাকা চাঁদের ছবি তুলতে সক্ষম হয়। ছবিগুলোতে দেখা যায়, সেখানে অসংখ্য ছোট-বড় গর্ত (craters) ও উঁচু পর্বতমালা রয়েছে, যা পৃথিবীর দিক থেকে দেখা অংশে অনুপস্থিত। পৃথিবী থেকে পাঠানো কোনো রেডিও তরঙ্গও চাঁদের সেই অংশে সরাসরি পৌঁছাতে পারে না।

পৃথিবী থেকে চাঁদের যে অংশ দেখা যায়, সেখানে ‘মারিয়া’ (Maria) নামের বৃহৎ ও অন্ধকার সমভূমির প্রাধান্য রয়েছে। এগুলো প্রাচীন আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের মাধ্যমে গঠিত হয়েছে। এই সমভূমি চাঁদের নিকটবর্তী অংশের পৃষ্ঠের প্রায় ৩১ শতাংশজুড়ে বিস্তৃত এবং আগ্নেয় শিলা ব্যাসাল্টিক উপাদানে সমৃদ্ধ। অন্যদিকে, চাঁদের পেছনের বা বিপরীত অংশে মারিয়ার মতো সমভূমি প্রায় নেই বললেই চলে। সেখানে প্রচুর পরিমাণে গর্ত বা ক্রেটার দেখা যায়।

সুতরাং, চাঁদের ঘূর্ণন ও প্রদক্ষিণের অদ্ভূত সমতা এবং কোটি কোটি বছরের বিবর্তন প্রক্রিয়ার কারণেই চাঁদের অন্য পাশ চিরদিনই আমাদের দৃষ্টির আড়ালে থেকে যাবে। বিজ্ঞান এই রহস্যের সমাধান করেছে। (সূত্র: সিএনএন ও স্পেস ডটকম)