টলিউডে ফেডারেশন-ডিরেক্টর্স গিল্ড সংঘাত চরমে, ভিডিও বার্তায় মুখ খুললেন পরিচালকরা !

গত বছর থেকে টলিউডে ফেডারেশন এবং ডিরেক্টর্স গিল্ডের মধ্যে চলা সংঘাত ক্রমশ তীব্র হচ্ছে। অভিযোগ, এই বিবাদ শুধু পরিচালকদেরই নয়, ক্ষতি করছে হাজার হাজার টেকনিশিয়ানদেরও। সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশিত একটি ভিডিও বার্তায় এই বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলেছেন অনির্বাণ ভট্টাচার্য, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়, সুদেষ্ণা রায়-সহ টলিউডের বহু পরিচিত মুখ। ভিডিওটিতে তাঁরা বর্তমান পরিস্থিতির জন্য ফেডারেশনের কিছু নিয়ম ও আচরণের দিকে আঙুল তুলেছেন।
ভিডিওটির মূল বার্তা ছিল টলিউডের টেকনিশিয়ান ভাইবোনেদের উদ্দেশ্যে। পরিচালকদের বক্তব্য, ফেডারেশনের কিছু নিয়মকানুন নিয়ে তাঁদের সঙ্গে দীর্ঘকাল ধরে বিবাদ চলছে। ফেডারেশন নাকি টেকনিশিয়ানদের বোঝাচ্ছে যে পরিচালকরা তাদের বিপক্ষে। কিন্তু পরিচালকরা বিশ্বাস করেন, টেকনিশিয়ানরা তাদের আসল উদ্দেশ্য জানেন, তবে “প্রবল চাপ ও হুমকির মুখে” তারা খোলাখুলি কিছু বলতে পারছেন না। ভিডিওটিতে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, এই পরিস্থিতিতে কারা টেকনিশিয়ানদের স্বার্থে কাজ করছে আর কারাই বা তাদের বিপক্ষে।
ফেডারেশনের মূল অভিযোগগুলির মধ্যে অন্যতম হল, পরিচালকরা টেকনিশিয়ানদের বিপক্ষে কাজ করছেন। এর জবাবে অভিনেতা-পরিচালক পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় একটি নির্দিষ্ট ঘটনার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, রাহুল মুখোপাধ্যায় চরকির জন্য কলকাতায় প্রথম কাজ শুরু করেছিলেন। কিন্তু কিছুদিন শুটিং হওয়ার পরেই ফেডারেশন টেকনিশিয়ানদের জন্য চারগুণ বেশি টাকা দাবি করে কাজ থামিয়ে দেয়। তাদের যুক্তি ছিল, চরকি একটি বিদেশি সংস্থা এবং ফেডারেশনের নিজস্ব “তথাকথিত নিয়ম” অনুযায়ী আন্তর্জাতিক ছবির ক্ষেত্রে এই ধরনের পেমেন্টের দাবি করা হয়।
এই ঘটনার পর চরকি তাদের ব্যবসা গুটিয়ে বাংলাদেশ চলে যায়। পরমব্রত প্রশ্ন তোলেন, এর ফলে যে কাজগুলো বাংলায় হতে পারত, তা বন্ধ হয়ে গেল। এতে কাদের ক্ষতি হলো? শুধু পরিচালকদের? যদি চরকি ১২টি কাজ করত, তবে ১২ জন পরিচালক কাজ হারাতেন। কিন্তু প্রতিটি কাজের সঙ্গে যুক্ত ৫০ থেকে ৭০ জন বা তারও বেশি টেকনিশিয়ানদের কাজও চলে গেল। ফেডারেশনের “গা জোয়ারির কারণে” আখেরে ক্ষতি টেকনিশিয়ানদেরই হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
এই সংঘাত নিরসনের জন্য মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তত্ত্বাবধানে টলিউড ইন্ডাস্ট্রির সমস্যা মেটাতে একটি কমিটি গঠনের কথা হয়েছিল। কিন্তু পরিচালকদের অভিযোগ, সরকারি তরফে চার মাস কেটে গেলেও কোনো নোটিস আসেনি, এমনকি মেল বা চিঠিরও কোনো উত্তর মেলেনি। এরপর ডিরেক্টর্স গিল্ড একটি সাংবাদিক সম্মেলন করে ফেডারেশনের কোন কোন নিয়ম নিয়ে তাদের সমস্যা, তা স্পষ্ট ভাবে তুলে ধরে। এতে ফেডারেশন আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে এবং যে সমস্ত পরিচালকরা ওই সাংবাদিক বৈঠকে অংশ নিয়েছিলেন, একে একে তাঁদের কাজ আটকানো শুরু হয়। বিভিন্ন টেকনিশিয়ানদেরও সেই সব পরিচালকের সঙ্গে কাজ করতে বাধা দেওয়া হয়। ভিডিওতে বলা হয়েছে, টলিউড ইন্ডাস্ট্রির সকলে জানেন যে, যখন কোনো টেকনিশিয়ান কাজে আসেন না, তখন “ওপর থেকে চাপ দিয়ে, ভয় দেখিয়ে” কাজে আসতে দেওয়া হয় না।
ফেডারেশনের তরফে বলা হয়েছে, যে নিয়মগুলোর বিরোধিতা করা হচ্ছে, সেগুলো পাল্টে গেলে টেকনিশিয়ানদের ক্ষতি হবে। এই প্রসঙ্গে পরিচালক সুদেষ্ণা রায় পাল্টা যুক্তি দিয়ে বলেন, “প্রথমত এই নিয়মগুলো ফেডারেশনের নিজস্ব। এগুলো একতরফা ভাবে বানানো হয়েছে।” তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে, ফেডারেশন একটি ট্রেড ইউনিয়ন এবং ভারতের কোথাও কোনো আইনে কোনো ট্রেড ইউনিয়ন নিয়ম বানাতে পারে না। এটা “দেশের আইন ও সংবিধান বিরোধী”। পরিচালক বিদুলা ভট্টাচার্য বর্তমান পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরে বলেন, “আগে বাইরের কত শুটিং এখানে হত। এখানেওবা কটা ছবি হচ্ছে। ২০২৪-এ মাত্র ৩৬টি ছবি হয়েছে।” পরমব্রতর শেষ কথা ছিল, এই নিয়মের ফলে টেকনিশিয়ানদের কাজ কমেছে কি না, তা টেকনিশিয়ানরাই সবচেয়ে ভালো বলতে পারবেন।
সামগ্রিকভাবে, ভিডিও বার্তায় উঠে আসা বক্তব্য অনুযায়ী, এই সংঘাত টলিউড ইন্ডাস্ট্রির স্বাভাবিক কাজকর্মে বড়সড় বাধা সৃষ্টি করছে এবং এর জেরে টেকনিশিয়ান সহ সংশ্লিষ্ট সকলের জীবিকা অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। কবে এই সমস্যার সমাধান হবে, সেটাই এখন দেখার।