OMG! “১০০ বছরের পুরনো রহস্যের সমাধান দিল AI “-দেখে চমকে গেলো বিজ্ঞনীরাও

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবার বিজ্ঞান জগতে এক শতাব্দী প্রাচীন এবং অত্যন্ত জটিল এক ধাঁধার সমাধান করে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞানীরা শক্তিশালী ও দীর্ঘস্থায়ী ব্যাটারির বিকাশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সমস্যার সমাধানে AI-এর সাহায্য নিয়েছেন। তাঁদের দাবি, এই আবিষ্কার ব্যাটারি প্রযুক্তি এবং অন্যান্য অনেক ক্ষেত্রে গবেষণার পথ খুলে দেবে।

দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞানীদের কাছে একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ক্ষুদ্র ন্যানোক্রিস্টালগুলির সঠিক পারমাণবিক কাঠামো বা গঠন নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা। ব্রিটিশ দৈনিক ইন্ডিপেন্ডেন্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ন্যানোক্রিস্টাল হলো অত্যন্ত ক্ষুদ্র এবং বিশৃঙ্খল প্রকৃতির উপাদান, যা ইলেকট্রনিক্স থেকে শুরু করে প্রত্নতত্ত্ব পর্যন্ত বিভিন্ন আধুনিক প্রযুক্তির অগ্রগতির জন্য ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ’। ব্যাটারি তৈরি সহ বিভিন্ন পদার্থের ধর্ম বোঝা ও উন্নত করার জন্য এদের সঠিক গঠন জানা অত্যাবশ্যক।

সমস্যাটি ছিল প্রচলিত পদ্ধতিতে। সাধারণত বড় এবং বিশুদ্ধ স্ফটিকের মধ্য দিয়ে এক্স-রে রশ্মি পাঠিয়ে এদের পারমাণবিক গঠন বিশ্লেষণ করা হয়। কিন্তু ন্যানোক্রিস্টালগুলি সাধারণত পাউডার আকারে থাকে এবং এদের ক্ষুদ্র ও অনিয়মিত গঠনের কারণে এক্স-রে রশ্মিগুলি অস্পষ্টভাবে ছড়িয়ে দেয়, ফলে এদের সঠিক গঠন নির্ধারণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায় এবং এই সমস্যাটি প্রায় এক শতাব্দী ধরে বিজ্ঞানীদের বিভ্রান্ত করে রেখেছিল।

নিউ ইয়র্কের কলম্বিয়া ইঞ্জিনিয়ারিং-এর (Columbia Engineering) একদল বিজ্ঞানী এই দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধানে অত্যাধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্য নিয়েছেন। তাঁরা একটি বিশেষভাবে তৈরি করা এআই অ্যালগরিদম তৈরি করেছেন, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘পিএক্সআরডিনেট’ (PXRDNet)।

এই অ্যালগরিদমটি ন্যানোক্রিস্টালের এক্স-রে ডিফ্র্যাকশন থেকে তৈরি হওয়া অস্পষ্ট প্যাটার্নগুলিকে বিশ্লেষণ করে উপাদানটির সঠিক পারমাণবিক কাঠামো অনুমান করতে পারে। কলম্বিয়া ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ম্যাটিরিয়াল সায়েন্স অ্যান্ড অ্যাপ্লাইড ফিজিক্স ও অ্যাপ্লাইড ম্যাথমেটিক্স বিভাগের অধ্যাপক সাইমন বিলিঞ্জ ব্যাখ্যা করে বলেন, “চ্যাটজিপিটি যেভাবে প্রচুর ভাষার ডেটা থেকে ভাষার ধরন শেখে, তেমনি এই এআই মডেলটিও হাজার হাজার পরিচিত কিন্তু সম্পর্কহীন কাঠামোর ডেটাবেইস থেকে পারমাণবিক বিন্যাসের জটিল ধরন শিখেছে।”

গবেষকদের তৈরি ‘পিএক্সআরডিনেট’ যন্ত্রটি হাজার হাজার পরিচিত উপাদানের উপর প্রশিক্ষিত। এর অসাধারণ ক্ষমতা হলো, এটি ১০ অ্যাংস্ট্রনমের (Angstrom) মতো অত্যন্ত ছোট স্ফটিকের কাঠামোও নির্ভুলভাবে বের করতে পারে। উল্লেখ্য, অ্যাংস্ট্রনম হলো পারমাণবিক আকারের মতো ক্ষুদ্র দূরত্ব পরিমাপের একক (এক মিটারের এক দশ বিলিয়ন ভাগের এক ভাগ)। ১০ অ্যাংস্ট্রনম একটি মানুষের চুলের চেয়ে প্রায় হাজার গুণ পাতলা।

বিজ্ঞানীরা দাবি করছেন, এটি পদার্থ বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে একটি বিশাল অগ্রগতি। এই AI টুলটি গবেষকদের এমন সব ন্যানোম্যাটিরিয়ালের গঠন শনাক্ত করতে সাহায্য করবে, যা প্রচলিত পদ্ধতি ব্যবহার করে আগে কখনোই সম্ভব ছিল না। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এআইয়ের যে ব্যাপক অগ্রগতি হয়েছে, এই উদ্ভাবন তারও একটি উজ্জ্বল প্রমাণ। গবেষকরা বলেছেন, এ ধরনের জটিল সমস্যার সমাধান আগে অর্থাৎ AI-এর এই উন্নত পর্যায় আসার আগে সম্ভব হত বলে মনে হয় না।

কলম্বিয়ার এই প্রকল্পের নেতৃত্ব দেওয়া গ্যাবে গুও বলেন, “আমি যখন মাধ্যমিকে ছিলাম, তখন এই ক্ষেত্রটি এমন অ্যালগরিদম তৈরি করতে হিমশিম খাচ্ছিল যা বিষয়টি বুঝতে আমাদের সাহায্য করতে পারে। এখন আমাদের মতো বিভিন্ন গবেষণায় বিজ্ঞানীদের শক্তি বাড়ানো এবং উদ্ভাবনকে নতুন স্তরে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে এআইয়ের বিশাল সক্ষমতার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।” কলম্বিয়া ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চেয়ারম্যান হড লিপসন আরও বলেন, “আমাকে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি বিস্মিত করেছে, তা হলো পদার্থবিজ্ঞান বা জ্যামিতিতে তুলনামূলকভাবে সীমিত জ্ঞান নিয়েও এই এআই এমন এক ধাঁধার সমাধান করতে শিখেছে, যা এক শতাব্দী ধরে বিশ্বজুড়ে গবেষকদের বিভ্রান্ত করেছে। দীর্ঘমেয়াদী চ্যালেঞ্জের মুখে থাকা অন্যান্য অনেক বৈজ্ঞানিক ক্ষেত্রের জন্য ভবিষ্যতে কী হতে চলেছে, এটি তারই এক শক্তিশালী লক্ষণ।”

সোমবার ‘অ্যাব ইনিশিও স্ট্রাকচার সলিউশনস ফ্রম ন্যানোক্রিস্টালাইন পাউডার ডিফ্র্যাকশন ডেটা ভায়া ডিফিউশন মডেলস’ (Ab Initio Structure Solutions From Nanocrystalline Powder Diffraction Data Via Diffusion Models) শিরোনামে এই যুগান্তকারী গবেষণা প্রবন্ধটি বিখ্যাত বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘নেচার ম্যাটিরিয়ালস’ (Nature Materials)-এ প্রকাশিত হয়েছে। এই আবিষ্কার পদার্থ বিজ্ঞান, রসায়ন এবং বিশেষ করে ব্যাটারি প্রযুক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলিতে নতুন গবেষণার দিগন্ত খুলে দেবে বলে আশা করা হচ্ছে।