গ্রীষ্মের অতিরিক্ত গরমে বাইকের যত্ন নেবেন যেভাবে, জেনেনিন কিছু গুরুত্বপূর্ণ টিপস

গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা যখন চরমে ওঠে, তখন শুধু আমাদের শরীরই ক্লান্ত হয় না, আমাদের নিত্যসঙ্গী প্রিয় বাইকটিও নানাবিধ সমস্যার সম্মুখীন হয়। অতিরিক্ত গরমের ফলে বাইকের ইঞ্জিনের তাপমাত্রা বৃদ্ধি, টায়ারের অস্বাভাবিক চাপ, ব্যাটারির কার্যক্ষমতা হ্রাস এবং ব্রেকিং সিস্টেম সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এই পরিস্থিতিতে আপনার বাইককে সুরক্ষিত, কর্মক্ষম এবং দীর্ঘস্থায়ী রাখার জন্য কিছু বিশেষ যত্ন নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে গরমের দিনে বাইকের পারফরম্যান্স যেমন কমে যেতে পারে, তেমনই বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কাও থাকে।
গরমের দিনে আপনার বাইকের যত্ন নিতে নিম্নলিখিত বিষয়গুলিতে মনোযোগ দিন:
১. ইঞ্জিন কুলিং সিস্টেম ঠিক রাখা: গরমের সময় বাইকের ইঞ্জিন স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি গরম হয়ে যায়। তাই নিয়মিত বিরতিতে ইঞ্জিন অয়েলের স্তর পরীক্ষা করুন এবং প্রয়োজনে গাড়ির ম্যানুয়াল অনুযায়ী সঠিক সান্দ্রতার (viscosity) তাপ প্রতিরোধী বা হাই গ্রেড ইঞ্জিন অয়েল ব্যবহার করুন। যদি আপনার বাইক লিকুইড কুলড ইঞ্জিন যুক্ত হয়, তাহলে রেডিয়েটরের কুলেন্ট লেভেল নিয়মিত পরীক্ষা করে তা সঠিক মাত্রায় আছে কিনা নিশ্চিত করুন। প্রয়োজনে কুলেন্ট টপ-আপ করুন বা পুরো কুলিং সিস্টেম ফ্ল্যাশ করিয়ে নতুন কুলেন্ট ভরুন।
২. টায়ারের যত্ন নেওয়া: উচ্চ তাপমাত্রায় টায়ারের অভ্যন্তরের বাতাসের চাপ স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়, যা টায়ার ফেটে যাওয়ার বা অপ্রত্যাশিত দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়। নিয়মিত টায়ারের প্রেশার প্রস্তুতকারকের নির্দেশিত মাত্রায় ঠিক আছে কি না পরীক্ষা করুন। মনে রাখবেন, খুব বেশি গরম টায়ারে অতিরিক্ত চাপ দিলে তা দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হয়; তাই টায়ার প্রেশার সব সময় শীতল পরিবেশে বা সকালে পরীক্ষা করা বুদ্ধিমানের কাজ। টায়ারে কোনো ফাটল, অসম ক্ষয় বা অস্বাভাবিকতা দেখা গেলে দ্রুত সার্ভিসিং করান।
৩. ব্যাটারির প্রতি যত্নশীল হওয়া: অতিরিক্ত গরমে বাইকের ব্যাটারি ওভারহিট হয়ে যেতে পারে, যার ফলে ব্যাটারির চার্জ দ্রুত শেষ হয়ে যাওয়ার বা কার্যক্ষমতা কমে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বিশেষ করে পুরনো বাইক বা ব্যাটারির ক্ষেত্রে এই সমস্যা বেশি দেখা যায়। যারা পুরনো মডেলের বাইক চালান, তারা ব্যাটারির ইলেকট্রোলাইট লেভেল (যদি প্রযোজ্য হয়) ঠিক আছে কি না তা অবশ্যই দেখুন। টার্মিনাল বা কানেকশনগুলো ক্ষয়মুক্ত, পরিষ্কার এবং টাইট আছে কি না তা নিশ্চিত করুন। প্রয়োজনে সার্ভিসিং করিয়ে নিন বা প্রয়োজনে ব্যাটারি পরিবর্তন করুন।
৪. ব্রেক সিস্টেম সচল রাখা: অতিরিক্ত গরমে ব্রেক ফ্লুইডের মধ্যে বাতাসের বুদবুদ সৃষ্টি হতে পারে, যাকে ‘ভ্যাপোর লক’ বলা হয়। এটি ব্রেক ফেলার একটি বড় কারণ হতে পারে এবং অত্যন্ত বিপজ্জনক। তাই গরমকালে ব্রেক ফ্লুইডের লেভেল ও অবস্থা নিয়মিত পরীক্ষা করুন এবং প্রস্তুতকারকের নির্দেশ অনুযায়ী সময়মতো পরিবর্তন করুন। ব্রেক প্যাড ও ডিস্কের ঘর্ষণ অংশ (friction parts) ঠিক আছে কি না তা-ও দেখে নেওয়া জরুরি। প্রয়োজনে ব্রেক সার্ভিসিং করান।
৫. বাইক পরিষ্কার ও কভার করে রাখা: বাইক সরাসরি প্রখর রোদে পার্ক করে রাখলে এর প্লাস্টিক ও রাবারের অংশগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, রঙ ফ্যাকাশে হয়ে যেতে পারে এবং সিট কভারের ক্ষতি হতে পারে। সম্ভব হলে বাইককে সব সময় ছায়াযুক্ত স্থানে পার্ক করুন অথবা একটি ভালো মানের বাইক কভার ব্যবহার করুন। বাইক ধুলোমাটি মুক্ত রাখতে নিয়মিত পরিষ্কার করুন। ধুলো জমে থাকলে তা যন্ত্রাংশের ক্ষতি করতে পারে এবং অতিরিক্ত তাপ শোষণ করতে পারে।
৬. অতিরিক্ত দীর্ঘ দূরত্বে গরমে চালানো এড়িয়ে চলা: অতিরিক্ত গরমের দিনে বা দুপুরে দীর্ঘ দূরত্বে বাইক চালানো এড়িয়ে চলুন। যদি লম্বা রাইড করতেই হয়, তাহলে কিছুক্ষণ পরপর নিরাপদ স্থানে বিরতি নিন যাতে ইঞ্জিন ঠান্ডা হতে পারে। অতিরিক্ত গরম অবস্থায় একটানা বাইক চালালে ইঞ্জিনের উপর চাপ পড়ে এবং ওভারহিটিং হতে পারে। এছাড়াও, অতিরিক্ত ভারী লোড বহন করা থেকে বিরত থাকুন, কারণ এতে ইঞ্জিনের উপর অতিরিক্ত বোঝা পড়ে।
৭. নিরাপত্তা সরঞ্জাম ব্যবহার: শুধুমাত্র বাইকের যত্ন নিলেই হবে না, রাইডার হিসেবে আপনার নিজের সুরক্ষার দিকেও খেয়াল রাখতে হবে। গরমের জন্য হালকা ও বাতাস চলাচল করে এমন (breathable) ফ্যাব্রিকের তৈরি রাইডিং গিয়ার যেমন জ্যাকেট, হেলমেট এবং গ্লাভস ব্যবহার করুন যাতে রাইডিংয়ের সময় আপনার শরীরও স্বস্তিতে থাকে এবং ঘামাচি বা অস্বস্তি এড়ানো যায়। পর্যাপ্ত জল পান করে শরীরকে হাইড্রেটেড রাখুন।
গ্রীষ্মের এই কঠিন সময়ে আপনার বাইকের প্রতি একটু বাড়তি যত্ন নিলে এটি যেমন দীর্ঘস্থায়ী হবে এবং ভালো পারফর্ম করবে, তেমনই আপনার রাইডিংও হবে মসৃণ ও নিরাপদ।
সূত্র: লাইভমিন্ট।