“ঠিক কীভাবে এসেছিল জঙ্গিরা?”-পহেলগাম হামলা তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য, যা জানালেন গোয়েন্দারা

জম্মু ও কাশ্মীরের পহেলগামে পর্যটকদের উপর হওয়া ভয়াবহ জঙ্গি হামলার তদন্তে প্রতিদিন নতুন নতুন চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসছে। তদন্তকারী সংস্থাগুলোর প্রাথমিক দাবি, জঙ্গিরা হামলা চালানোর জন্য অত্যন্ত দুর্গম পথ বেছে নিয়েছিল এবং সুপরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের নির্দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্তের দায়িত্ব গ্রহণ করেছে জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা (এনআইএ) এবং তারা ইতিমধ্যেই ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রমাণ সংগ্রহের কাজ শুরু করেছে।

তদন্তকারীদের প্রাথমিক দাবি অনুসারে, হামলাকারী জঙ্গিরা প্রায় ২০ থেকে ২২ ঘণ্টা ধরে দুর্গম পাহাড়ি পথে ট্রেক করে এসেছিল। তারা কোকেরনাগ জঙ্গল এলাকা থেকে রওনা দিয়েছিল এবং পহেলগামের কাছে বৈসরান উপত্যকা (আরু ভ্যালি) পর্যন্ত পৌঁছানোর জন্য এই দীর্ঘ ও কঠিন পথ পেরিয়েছিল।

সূত্র মারফত জানা গেছে, হামলার সময় জঙ্গিরা ঘটনাস্থল থেকে দু’টি মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিয়েছিল – একটি ছিল স্থানীয় এক বাসিন্দার এবং অন্যটি এক পর্যটকের। তদন্তকারীদের দাবি অনুযায়ী, এই হামলায় মোট চারজন জঙ্গি জড়িত ছিল। এদের মধ্যে তিনজন পাকিস্তানি এবং একজন স্থানীয় যুবক, যার নাম আদিল ঠোকার বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।

তদন্তে আদিল ঠোকারের চাঞ্চল্যকর অতীত উঠে এসেছে। ২০১৮ সালে সে স্থানীয় জঙ্গি গোষ্ঠী হিজবুল মুজাহিদিনে যোগ দিয়েছিল। এরপর সে পাকিস্তানে পালিয়ে যায় এবং সেখানে লস্কর-ই-তৈবার (LeT) ঘাঁটিতে দীর্ঘ ৬ বছর ধরে অত্যাধুনিক অস্ত্র প্রশিক্ষণ নেয়। ২০২৪ সালে প্রশিক্ষণ শেষে সে কাশ্মীরে ফেরে। গোয়েন্দারা মনে করছেন, কাশ্মীরে ফেরার পর থেকেই আদিল উপত্যকায় লুকিয়ে থাকা পাকিস্তানি জঙ্গিদের জন্য রসদ সংগ্রহ করা এবং দুর্গম পাহাড়ি এলাকা পেরোনোর জন্য গাইড হিসেবে কাজ করছিল। পহেলগাম হামলায় তার এই ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের প্রাথমিক রিপোর্ট বলছে, গত ২২ এপ্রিলের এই হামলায় অত্যাধুনিক AK-47 এবং M4 রাইফেল ব্যবহার করা হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া কার্তুজের নমুনা পরীক্ষা করে এই শক্তিশালী অস্ত্র ব্যবহারের প্রমাণ মিলেছে।

ঘটনার দিনের বর্ণনা দিতে গিয়ে সূত্রগুলো বলছে, সেদিন প্রথমে দুই জঙ্গি জঙ্গল এলাকা থেকে বেরিয়ে এসে পর্যটকদের উপর চড়াও হয়। তারা প্রথমে পর্যটকদের ইসলামিক কলেমা (Kalma) পড়তে চাপ দেয় এবং এরপর অত্যন্ত কাছ থেকে গুলি করে চারজন নিরীহ মানুষকে হত্যা করে। এই নৃশংস হামলার পর পর্যটকরা আতঙ্কে এদিক ওদিক ছোটাছুটি শুরু করেন। একই সময়ে, অন্য দুই জঙ্গি বৈসরান উপত্যকার কাছে জিপলাইন এলাকার দিকে গুলি চালাতে শুরু করে।

এই পুরো ঘটনার এক বড় প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন স্থানীয় এক ফটোগ্রাফার। তিনি একটি গাছের উপর বসে সাহসিকতার সঙ্গে হামলার পুরো ভিডিও রেকর্ড করেন। তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, তাঁর তোলা ভিডিও ফুটেজ তদন্তে অত্যন্ত সহায়ক হচ্ছে এবং হামলার পুরো ঘটনাপ্রবাহ ও জঙ্গিদের গতিবিধি বুঝতে সাহায্য করছে।

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের নির্দেশ পাওয়ার পর এনআইএ আনুষ্ঠানিকভাবে পহেলগাম হামলার তদন্তের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছে। যদিও এনআইএ-এর একটি টিম গত বুধবারই ঘটনাস্থলে পৌঁছে তদন্ত শুরু করে দিয়েছিল। সিনিয়র অফিসারদের তত্ত্বাবধানে ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ সংগ্রহ করা হচ্ছে। এনআইএ টিম ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে নিয়ে বৈসরান উপত্যকার প্রতিটি অঞ্চল নিবিড়ভাবে খতিয়ে দেখছে। একই সঙ্গে প্রত্যক্ষদর্শীদের জিজ্ঞাসাবাদ করে হামলার সম্পূর্ণ টাইমলাইন তৈরির চেষ্টা চলছে। উপত্যকার ঢোকা ও বের হওয়ার সম্ভাব্য পথগুলোও বিশদভাবে পরীক্ষা করা হচ্ছে, যাতে জঙ্গিদের পালানোর রুট সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। তদন্ত পুরোদমে এগিয়ে চলেছে এবং আরও তথ্য সামনে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।