বিশেষ: পুরুষের জন্য নতুন জন্মনিরোধক আবিষ্কার, একবার ব্যবহারে নিশ্চিন্ত দুই বছর!

পুরুষদের জন্য কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদী একটি জন্মনিরোধক তৈরির চেষ্টা বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিনের। অবশেষে সেই প্রচেষ্টা সফল হতে চলেছে বলে মনে হচ্ছে। সম্প্রতি ‘অ্যাডাম’ (Adam) নামের একটি নতুন পুরুষ জন্মনিরোধক জেলের প্রথম ধাপের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল সফল হয়েছে। এটি পানিতে দ্রবণীয় এক ধরনের হাইড্রোজেল, যা পুরুষের শুক্রাণু নালি ব্লক করে দেয়। এর ফলে শুক্রাণু আর বীর্যের সঙ্গে মিশতে পারে না, যা গর্ভধারণ রোধ করতে সাহায্য করে। সবচেয়ে বড় কথা, এটি শরীরের হরমোনে কোনো পরিবর্তন করে না, যা প্রচলিত কিছু জন্মনিরোধকের একটি বড় সুবিধা।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি এই হাইড্রোজেলের প্রথম ধাপের পরীক্ষামূলক প্রয়োগে উৎসাহব্যঞ্জক ফলাফল মিলেছে। তাতে দেখা গেছে, এই জন্মনিরোধক একবার প্রয়োগ করলে প্রায় দুই বছর পর্যন্ত কার্যকর থাকতে পারে।

‘অ্যাডাম’ নামের এই জন্মনিরোধক জেলটি তৈরি করেছে কন্ট্রালাইন (Contraline) নামের একটি কোম্পানি। তারা কনডম ও ভ্যাসেকটমির বিকল্প হিসেবে এটিকে বাজারে আনার চেষ্টা করছে। কন্ট্রালাইনের দাবি, হাইড্রোজেলটি নির্দিষ্ট সময় পর (প্রায় দুই বছর) শরীরে ধীরে ধীরে মিশে যাবে। তখন শুক্রাণু নালিতে বাধা থাকবে না এবং পুরুষের প্রজনন প্রক্রিয়া স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে।

কন্ট্রালাইন তাদের প্রথম ধাপের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেছে। এতে দেখা গেছে, হাইড্রোজেলটি পরীক্ষামূলকভাবে প্রয়োগ করা দুজন অংশগ্রহণকারীর ক্ষেত্রে ২৪ মাস ধরে সফলভাবে শুক্রাণুর পথ আটকাতে পেরেছে এবং তাদের বীর্যে কোনো শুক্রাণু পাওয়া যায়নি। এই দীর্ঘ সময়ে তাঁদের শরীরে কোনো গুরুতর বিরূপ প্রতিক্রিয়াও দেখা যায়নি।

কন্ট্রালাইনের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কেভিন আইজেনফ্র্যাটস এই ফলাফলকে অত্যন্ত উৎসাহব্যঞ্জক হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, “এটি সত্যিই উৎসাহব্যঞ্জক! কারণ, প্রথম দিন থেকেই আমাদের লক্ষ্য ছিল, দুই বছরমেয়াদি পুরুষের জন্মনিরোধক তৈরি করা। সেটি যে সম্ভব, তা প্রথম পরীক্ষার তথ্য-উপাত্তেই প্রমাণিত।” তিনি আরও জানান, এই জেল প্রয়োগে খুব সহজ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। এই কাজে মাত্র ১০ মিনিটের মতো সময় লাগে এবং কেবলমাত্র প্রয়োগের স্থানেই স্থানীয় অ্যানেসথেসিয়া দেওয়া হয়। এরপর শরীরে নির্দিষ্ট স্থানে ছোট সার্জারির মাধ্যমে শুক্রাণু নালী বের করে এনে সেখানে ইনজেকশনের মাধ্যমে এই হাইড্রোজেল পুশ করা হয়। তারপর শুক্রাণু নালী যথাস্থানে রেখে কাটা স্থান সেলাই করে বন্ধ করে দেওয়া হয়।

শুক্রাণু নালি ব্লক করার মাধ্যমে কাজ করে পুরুষের জন্য এমন জন্মনিরোধক তৈরির চেষ্টা এই প্রথম নয়। আগের পদ্ধতিগুলোতে এমন উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছে যা শরীরে সহজে মিশে যেতে পারে না এবং সেগুলো অপসারণও জটিল ছিল। আইজেনফ্র্যাটস বলেন, ওই ইমপ্লান্টগুলো অপসারণের পর পুরুষের উর্বরতা ফিরে আসার তথ্য-উপাত্ত তেমন জোরালো ছিল না। পাশাপাশি সেগুলো শুক্রাণু নালিতে ক্ষত সৃষ্টি করে স্থায়ী বন্ধ্যত্বের কারণ হতে পারে বলেও উদ্বেগ ছিল। ‘অ্যাডাম’ হাইড্রোজেল সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শরীরে মিশে যাবে বলে দাবি করা হচ্ছে, যা আগের পদ্ধতির এই সমস্যাগুলোর সমাধান করতে পারে।

তবে ‘অ্যাডামের’ প্রথম ধাপের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ফলাফল এখনো কোনো পিয়ার-রিভিউড জার্নালে প্রকাশিত হয়নি। আইজেনফ্র্যাটস এটিকে “পুরুষদের জন্য আইইউডি বা ইন্ট্রা-ইউটেরাইন ডিভাইসের মতো একটি প্রতিবন্ধক” হিসেবে তুলনা করেছেন, যা গর্ভধারণ রোধ করতে সাহায্য করবে। তিনি জানান, দুই বছর পর পুরুষেরা চাইলে আরেকটি ইমপ্লান্ট নিতে পারবেন।

কন্ট্রালাইন জানিয়েছে, চলতি বছরের শেষের দিকে অস্ট্রেলিয়ায় ৩০ থেকে ৫০ জন অংশগ্রহণকারীকে নিয়ে দ্বিতীয় ধাপের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরু হতে পারে। ইউনিভার্সিটি অব এডিনবরার হরমোনভিত্তিক পুরুষ গর্ভনিরোধক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক রিচার্ড অ্যান্ডারসন এই ফলাফলকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, “এটি আসলে কাজ করে বলে মনে হচ্ছে, খুবই দারুণ!”

তবে ওয়াশিংটন স্টেট ইউনিভার্সিটির প্রফেসর জন ওটলি মনে করেন, ‘অ্যাডাম’ ইমপ্লান্ট কত দিন স্থায়ী হয় তা এখনো স্পষ্ট নয় এবং তিনি নেতিবাচক ডেটা প্রকাশের অপেক্ষায় আছেন। ওটলি আরও বলেন, ‘অ্যাডাম’ ইমপ্লান্ট পুরুষদের জন্য শক্তিশালী জন্মনিরোধক বিকল্প হলেও এর ব্যবহার সীমিত হতে পারে, কারণ বেশিরভাগ পুরুষ সার্জারির চেয়ে পিল, প্যাচ বা ইনজেকশন জাতীয় পদ্ধতি পছন্দ করবেন।

প্রথম ধাপের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের এই উৎসাহব্যঞ্জক ফলাফল পুরুষদের জন্মনিরোধকের ক্ষেত্রে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। তবে পূর্ণাঙ্গ সাফল্য এবং বাজারে আসার জন্য আরও বড় পরিসরের পরীক্ষা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনের প্রয়োজন হবে। হরমোন পরিবর্তন ছাড়াই কাজ করতে পারে এমন পুরুষের জন্মনিরোধক পিল নিয়েও সম্প্রতি গবেষণার খবর সামনে এসেছে। সব মিলিয়ে পুরুষের জন্মনিরোধকের ক্ষেত্রে একাধিক নতুন বিকল্প সামনে আসার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।