“ICU থেকে ছাড়া পেয়ে জেনারেল বেডে ট্রান্সফার…!”-ধর্না ছেড়ে স্কুলে ফিরছেন ‘যোগ্য’রা, তবু ফেরেনি স্বস্তি

সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে চাকরি বাতিলের পর ‘যোগ্য’ এবং ‘অযোগ্য’ হিসেবে চিহ্নিত হওয়া স্কুল শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মচারীদের মধ্যে সংঘাত এবার প্রকাশ্যে চলে এলো। এতদিন সল্টলেকে স্কুল সার্ভিস কমিশনের (SSC) অফিসের সামনে যে ‘যোগ্য’ শিক্ষকরা ধর্না আন্দোলন চালাচ্ছিলেন, বৃহস্পতিবার থেকে সেই রাস্তার দখল নিলেন সুপ্রিম কোর্টের রায়ে ‘টেন্টেড’ বা ‘অযোগ্য’ হিসেবে চিহ্নিত হওয়া অন্য একটি দল। তারাও নিজেদের ‘যোগ্য’ দাবি করে ধর্নায় বসতেই এসএসসি অফিসের সামনে এক নজিরবিহীন সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি হয়।
বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই এসএসসি ভবনের সামনে ‘যোগ্য’ শিক্ষকদের ধর্নায় উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে কম ছিল। আন্দোলনকারীদের একাংশ সোশ্যাল মিডিয়ায় দ্রুত ধর্নাস্থলে আসার জন্য আবেদন জানিয়েছেন। বিভিন্ন জেলা থেকে খবর পাওয়া গেছে, যে সব ‘যোগ্য’ শিক্ষক-শিক্ষিকার নাম কমিশনের প্রকাশিত তালিকায় মাসিক বেতনের জন্য অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, তাদের অনেকেই এদিন স্কুলে কাজে যোগ দিয়েছেন।
পূর্ব বর্ধমান জেলার গলসি এলাকার এক স্কুলে কাজে যোগ দেওয়া শিক্ষক সুমন সরকার তার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলেন, তাদের অবস্থা যেন “আইসিসিইউ থেকে ছাড়া পেয়ে জেনারেল বেডে ট্রান্সফার হওয়ার মতো”। তিনি জানান, স্কুলে এলেও এবং ক্লাস নিলেও আগামী দিন আবার এই স্কুলে ফিরতে পারবেন কিনা সেই অনিশ্চয়তা তাদের মধ্যে কাজ করছে, কারণ ৩১ ডিসেম্বরের নির্দেশনার কথা তাদের সব সময়েই ভাবাচ্ছে।
পুরুলিয়ার কাশীপুর জেকেএম গার্লস হাই স্কুলের ভারপ্রাপ্ত শিক্ষিকা নমিতা পণ্ডিত জানান, তাদের তিন শিক্ষিকার মধ্যে দু’জন এদিন স্কুলে এসেছেন, যদিও তারা হাজিরা খাতায় সই করেননি বা ক্লাস নেননি। উত্তর ২৪ পরগনার বনগাঁর কুমুদিনী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের সাতজন চাকরিহারা শিক্ষিকার মধ্যে পাঁচজন এদিন স্কুলে এসেছেন, বাকি দু’জনের একজন অসুস্থ এবং অন্যজন মাতৃত্বকালীন ছুটিতে আছেন।
দক্ষিণ ২৪ পরগনার মথুরাপুরের কৃষ্ণচন্দ্রপুর হাইস্কুলের আটজন চাকরিহারা শিক্ষক-শিক্ষিকার মধ্যে ছ’জন এদিন কাজে যোগ দিয়েছেন। স্কুলের প্রধান শিক্ষক চন্দন মাইতি জানান, বাকি দু’জনও দ্রুত যোগ দেবেন বলে তারা আশাবাদী এবং তাদের স্কুলের আটজন শিক্ষক-শিক্ষিকাকেই যোগ্য তালিকায় রাখায় তারা কিছুটা হলেও স্বস্তিতে আছেন। মেদিনীপুর সদর ব্লকের চাঁদড়া হাই স্কুলেও পাঁচজন চাকরিহারা শিক্ষকের সবাই বৃহস্পতিবার স্কুলে এসেছিলেন।
তবে এদিনও সল্টলেকে এসএসসি ভবনের সামনে উপস্থিত ‘যোগ্য’ শিক্ষকরা অভিযোগ করেন যে ‘টেন্টেড’দের জন্যই তাদের চাকরি গেছে। পাল্টা ‘অযোগ্য’রা বলেছেন, “ওঁরা আমাদের অযোগ্য বলার কে? সুপ্রিম কোর্টও আমাদের অযোগ্য বলতে পারেনি।” শিক্ষা দপ্তর যে তালিকা জেলায় জেলায় পাঠিয়েছে তাতে এই ‘টেন্টেড’ শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীদের নাম নেই। তারা অবিলম্বে তাদের নামও তালিকাভুক্ত করার দাবিতে আন্দোলন শুরু করেছেন। দুই পক্ষের মাইক বাজানো, স্লোগান এবং পাল্টাপাল্টি সভা ও স্লোগানে সল্টলেকের ইই ব্লকের এসএসসি ভবনের সামনে পরিস্থিতি সরগরম হয়ে ওঠে।
সন্ধ্যার পর ‘অযোগ্য’ শিক্ষকদের তরফে কমলেশ কাপাট জানান, তাদের সভা চলাকালীন ‘যোগ্য’রা পাল্টা মাইক বাজিয়ে এবং জাতীয় সঙ্গীত গেয়ে তাদের বিরক্ত করছিলেন, যার ফলে কিছুটা তর্কাতর্কি হয়। যদিও পরে তারা ‘যোগ্য’দের ডিম-ভাতের নৈশভোজে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব দেন। ‘যোগ্য’ শিক্ষকদের তরফে চিন্ময় মণ্ডল বলেন, সুপ্রিম কোর্টের রায়ে স্পষ্ট যে অযোগ্যদের জন্যই তাদের চাকরি গেছে। সেই কারণেই অযোগ্যদের দেখে কিছু শিক্ষক উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলেন এবং অযোগ্যরাও লাগাতার উস্কানি দিয়ে যাচ্ছিলেন। তবে তিনি স্বীকার করেন যে অযোগ্যদেরও গণতান্ত্রিক অধিকার রয়েছে।
‘যোগ্য’দের আন্দোলন কি তবে ক্রমশ থিতিয়ে যাচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তরে চিন্ময় জানান, সামনেই গরমের ছুটি পড়বে। শিক্ষকরা স্কুলে গিয়েছিলেন যোগ্যতার প্রমাণ দিতেই এবং সেই কাজ মিটিয়ে দ্রুত তারা আবার আন্দোলনকেই ফিরে আসবেন। এর মধ্যেই সুপ্রিম কোর্টে রিভিউ পিটিশনের জন্য ওকালতনামায় স্বাক্ষর সংগ্রহের কাজও চালাচ্ছেন তারা। সব মিলিয়ে এসএসসি চাকরিহারাদের এই আন্দোলন এবং তার পরবর্তী গতিপ্রকৃতির দিকে সকলের নজর রয়েছে।