পহেলগাঁও হামলার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই পাকিস্তানের উপর কূটনৈতিক আঘাত! সামরিক কূটনীতিককে দেশ ছাড়ার নির্দেশ ভারতের

কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ে পর্যটকদের উপর ভয়াবহ জঙ্গি হামলার ঘটনার মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই পাকিস্তানকে কড়া কূটনৈতিক বার্তা দিল ভারত। বুধবার গভীর রাতে পাকিস্তানের শীর্ষ কূটনীতিক সাদ আহমদ ওয়াররাইচ-কে জরুরি তলব করে হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে ‘পার্সোনা নন গ্রাটা’ (Persona Non Grata) নোট। এই নোটের মাধ্যমে ভারতে নিযুক্ত সমস্ত পাকিস্তানি সামরিক কূটনীতিককে এক সপ্তাহের মধ্যে দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

প্রতিরক্ষা, নৌ ও বায়ুসেনার অ্যাটাশে সহ পাকিস্তানি হাইকমিশনের যে সমস্ত সামরিক আধিকারিক ভারতে কর্মরত ছিলেন, তাঁদের একযোগে বহিষ্কার করা হয়েছে। এই পদক্ষেপের পাল্টা হিসেবে ভারতও ইসলামাবাদে নিযুক্ত তাদের সামরিক প্রতিনিধিদের দেশে ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দিল্লির কূটনৈতিক মহলের মতে, এই পদক্ষেপ শুধুমাত্র প্রতীকী নয়, বরং এর মাধ্যমে ভারত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে কার্যত স্থগিত করার দিকেই এগোচ্ছে।

কেবল কূটনীতিক বহিষ্কারই নয়, সীমান্ত পথ বন্ধ করার মতো আরও কঠোর পদক্ষেপের ইঙ্গিত মিলেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে বুধবার রাতে আয়োজিত ক্যাবিনেট কমিটি অন সিকিউরিটি (CCS)-র জরুরি বৈঠকে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, বিদেশমন্ত্রী এস জয়শংকর, প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল সহ মন্ত্রিসভার শীর্ষ নেতারা এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলি অভূতপূর্ব বলেই মনে করা হচ্ছে।

এই বৈঠকে গৃহীত প্রধান সিদ্ধান্তগুলির মধ্যে রয়েছে:

ভারতে নিযুক্ত পাকিস্তানি সামরিক কূটনীতিকদের বহিষ্কার করা।
ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সিন্ধু জলচুক্তি (Indus Water Treaty) সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা।
ভারতের কয়েকটি মূল সীমান্ত প্রবেশপথ বন্ধ করার প্রস্তুতি শুরু করা।
ভারত ও পাকিস্তানের হাইকমিশনগুলির কার্যক্রম আংশিকভাবে বন্ধের পথে নিয়ে যাওয়া।
বুধবার রাতেই সাংবাদিক সম্মেলনে বিদেশসচিব বিক্রম মিস্রি পাকিস্তানের উদ্দেশ্যে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “এই হামলার নেপথ্যে যারা রয়েছে, যারা এর পরিকল্পনা করেছে, অথবা মদত দিয়েছে—তাদের কাউকেই রেয়াত করা হবে না। ভারত প্রতিশোধে বিশ্বাসী নয়, কিন্তু ন্যায়বিচারে বিশ্বাস রাখে। আমরা থামব না, মাথা নত করব না।”

উল্লেখ্য, গত মঙ্গলবার বিকেলে কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ের জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র বৈসরন, যা ‘মিনি সুইজারল্যান্ড’ নামে পরিচিত, সেখানে নারকীয় হামলা চালায় একদল সশস্ত্র জঙ্গি। ঘোড়ায় চেপে আসা পর্যটক এবং পাইন অরণ্যে প্রকৃতির শোভা উপভোগ করতে থাকা পরিবারের উপর হামলা চালানো হয়। বেছে বেছে হিন্দু পর্যটকদের লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয় বলে অভিযোগ। এই হামলায় মোট ২৬ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ২৫ জন ভারতীয় নাগরিক এবং ১ জন নেপালি পর্যটক। আহত হয়েছেন আরও অনেকে। এই হামলার দায় স্বীকার করেছে টিআরএফ (TRF) বা দ্য রেসিস্টেন্স ফ্রন্ট, যা লস্কর-ই-তইবা (Lashkar-e-Taiba)-র একটি ছায়া সংগঠন।

জম্মু-কাশ্মীরের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লা এই হামলা প্রসঙ্গে বলেন, “সাম্প্রতিক অতীতে বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্য করে এমন ভয়ঙ্কর হামলা আর দেখিনি।”

দিল্লির পক্ষ থেকে যেভাবে এত দ্রুত এবং দৃঢ় কূটনৈতিক ভাষায় পাকিস্তানকে জবাব দেওয়া হলো, তা শুধু একটি প্রতিক্রিয়া নয়, বরং একটি স্পষ্ট বার্তা: যারা সন্ত্রাসে আশ্রয় দেবে, তাদের জন্য কূটনীতির দরজা বন্ধ করতেও ভারত পিছপা হবে না।