“বারবার বলতে থাকি, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ…”-উপস্থিত বুদ্ধিতে যেভাবে প্রাণে বাঁচলেন বাংলার দেবাশিস

কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ের বৈসরন উপত্যকায় গত মঙ্গলবারের ভয়াবহ জঙ্গি হামলায় নিরীহ পর্যটকদের ধর্ম চিহ্নিত করে নির্বিচারে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই চরম বিভীষিকার মাঝেও অলৌকিকভাবে প্রাণে রক্ষা পেয়েছেন অসমের এক বাঙালি পর্যটক, অসম বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর দেবাশিস ভট্টাচার্য। এক জঙ্গির মুখোমুখি হয়ে স্রেফ বুদ্ধির জোরে এবং আকস্মিকভাবে ‘কালমা’ উচ্চারণ করেই তিনি প্রাণে বেঁচে ফিরতে পেরেছেন বলে জানিয়েছেন।

পরিবারের সঙ্গে ছুটি কাটাতে কাশ্মীর গিয়ে দেবাশিস ভট্টাচার্য পহেলগাঁওয়ের সেই দুর্ভাগ্যজনক হামলার সাক্ষী হয়েছেন। মর্মান্তিক মুহূর্তে জঙ্গির মুখোমুখি হওয়ার সেই ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা তিনি নিজেই বর্ণনা করেছেন।

দেবাশিস ভট্টাচার্য জানান, ঘটনার সময় তিনি ও তাঁর পরিবার একটি গাছের নীচে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তখনই চারদিক থেকে ‘কালেমা’ পড়ার আওয়াজ ভেসে আসে। তিনি বলেন, “আমি শুনছিলাম চারপাশে মানুষজন কালমা পড়ছে। তখন আমি নিজেও না ভেবে পড়তে শুরু করি।”

ঠিক সেই মুহূর্তেই একে ৪৭ হাতে এক জঙ্গি তাঁর সামনে এসে দাঁড়ায়। অধ্যাপক ভট্টাচার্য বলেন, “সে আমাকে জিগ্যেস করল, ‘‌তুমি কী বলছো?’‌ আমি তখনও বারবার বলতে থাকি— ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ।’‌ কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থেকে সে চলে যায়।”

এই ঘটনাই সম্ভবত তাঁর প্রাণ বাঁচিয়ে দিয়েছে বলে মনে করেন তিনি। তিনি জানান, জঙ্গি তাঁকে সরাসরি কিছু বলেনি, কিন্তু চারপাশে যখন সবাই প্রাণভয়ে ধর্মীয় বচন পাঠ করছিল, তখন তিনিও যেন এক অজ্ঞাত কারণে তাতে যোগ দেন। সেই চরম আতঙ্কের মুহূর্তে আর কিছু ভাবার সময় ছিল না।

ঘটনার খবর পাওয়ার পরই অসম সরকার দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করে। অসমের মুখ্যমন্ত্রীর দফতর থেকে ‘এক্স’ হ্যান্ডেলে জানানো হয় যে, দেবাশিস ভট্টাচার্য ও তাঁর পরিবারের নিরাপদে অসমে ফেরার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। তাঁদের দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য ভারত সরকারের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। দেবাশিস ভট্টাচার্য নিজে নিশ্চিত করেছেন যে তিনি ও তাঁর পরিবার সম্পূর্ণ নিরাপদ রয়েছেন এবং তাঁরা আগামী ২৬ এপ্রিলের মধ্যে শ্রীনগরে পৌঁছবেন। সেখান থেকে তাঁদের অসমে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা চলছে।

উল্লেখ্য, মঙ্গলবারের পহেলগাঁওয়ের বৈসরন উপত্যকার হামলায় প্রায় ২৮ জন নিরীহ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, যাদের অধিকাংশই ছিলেন পর্যটক। এই বর্বর হামলায় গোটা দেশজুড়ে শোক ও ক্ষোভের বাতাবরণ তৈরি হয়েছে। জঙ্গিগোষ্ঠী ‘দ্য রেসিস্ট্যান্স ফ্রন্ট (TRF)’, যা লস্কর-ই-তৈবার একটি শাখা সংগঠন, তারা এই হামলার দায় স্বীকার করেছে।

এই জঘন্য হামলার পর ভারত পাকিস্তানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক কমাচ্ছে বলে খবরে প্রকাশ। কয়েকটি কৌশলগত প্রকল্প, যেমন ইন্দাস জল চুক্তি এবং পাকিস্তানি নাগরিকদের জন্য সার্ক ভিসা ছাড় সাময়িকভাবে স্থগিত করে দেওয়া হয়েছে বলেও জানানো হয়েছে।

দেবাশিস ভট্টাচার্যের এই অলৌকিকভাবে বেঁচে ফেরার ঘটনা পহেলগাঁও হামলার বিভীষিকার মধ্যেও আশার এক ক্ষীণ আলো দেখিয়েছে, তবে একই সঙ্গে জঙ্গিদের ধর্ম চিহ্নিত করে বেছে বেছে হত্যার নৃশংস কৌশলকেও সামনে এনে দিয়েছে।