মায়ানমারের ভয়াবহ ভূমিকম্প ৩০০ পরমাণু বোমার সমান, ভারতেও মহাবিপর্যয়ের আশঙ্কা

গত ২৮শে মার্চ মায়ানমারে আঘাত হানা ৭.৭ মাত্রার ভয়াবহ ভূমিকম্প শুধু সেই দেশেই নয়, প্রতিবেশী থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংকককেও প্রবলভাবে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে মায়ানমারে তিন হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, এবং থাইল্যান্ডে মৃতের সংখ্যা ১৭। ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞরা এই কম্পনের তীব্রতা তুলনা করেছেন ৩০০টি পরমাণু বোমার সম্মিলিত বিস্ফোরণের সঙ্গে, যা প্রকৃতির এক বিধ্বংসী রূপ।
এই শক্তিশালী ভূমিকম্পে মায়ানমারের ইনওয়া সেতু সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়েছে এবং বহু ঘরবাড়ি ও ইমারত ধূলিসাৎ হয়েছে। ভূবিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, সাগাইং ফল্টের strike-slip fault-এর কারণে এই ভূমিকম্প সংঘটিত হয়েছে। এটি পৃথিবীর ভূ-আলোড়নের একটি বড় উদাহরণ। তবে উদ্বেগজনক বিষয় হল, বিজ্ঞানীরা ভারতেও একইরকম ভয়াবহ ভূমিকম্পের আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, যদিও তা কবে ঘটবে সেই বিষয়ে এখনও নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না।
বহু বছর ধরে বিজ্ঞানীরা হিমালয় অঞ্চলে বড় ধরনের ভূমিকম্পের বিষয়ে সতর্ক করে আসছেন। রিখটার স্কেলে ৮ বা তার বেশি মাত্রার “মহা হিমালয়ান ভূমিকম্প” উত্তর ভারতে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ঘটাতে পারে। প্রখ্যাত মার্কিন ভূ-পদার্থবিদ রজার বিলহাম “টাইমস অফ ইন্ডিয়া”কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেছেন, “ভারত প্রতি শতাব্দীতে তিব্বতের দক্ষিণ প্রান্ত থেকে ২ মিটার নীচে নেমে যায়।” তিনি আরও বলেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে, ভারতীয় পাতের উত্তর প্রান্ত একই হারে নীচে নামে না এবং বছরের পর বছর ধরে তা ঝুলে থাকে। এই পরিস্থিতি যে কোনো মুহূর্তে বড় ধরনের ভূমিকম্পের কারণ হতে পারে। রজার বিলহামের মতে, হিমালয়ে বড় ভূমিকম্প হওয়া এখন সময়ের অপেক্ষা।
তিনি আরও জানান, “৮ রিখটার স্কেলের চেয়ে বেশি মাত্রার ভূমিকম্প হিমালয়ে কয়েকশো বছরে একবার হয়েছে। কিন্তু গত ৭০ বছরে হিমালয়ের ভাঁজে যে পরিমাণ চাপ তৈরি হয়েছে, তা কমানোর মতো কোনো বড় ভূমিকম্প হয়নি। এটা হওয়া উচিত, এবং এর সম্ভাবনাও প্রবল।”
ভূমিকম্পে ভারতের কোন রাজ্যগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের প্রায় ৫৯ শতাংশ এলাকা হিমালয়ের ভূমিকম্পের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। হিমাচল প্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, বিহার এবং উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলো বিশেষভাবে বিপজ্জনক অবস্থায় রয়েছে। এমনকি দিল্লি, মুম্বাই ও কলকাতার মতো বড় শহরগুলোও ভূমিকম্পের ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের মধ্যে পড়ে বলে বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন।
ভারতে কেন বেশি ক্ষতির আশঙ্কা?
ভারতে ভূমিকম্পের ফলে ক্ষতির পরিমাণ অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশি হওয়ার প্রধান কারণ হল এখানকার দুর্বল নির্মাণ কাঠামো। উন্নত দেশগুলোতে ভূমিকম্প প্রতিরোধী ভবন নির্মাণে কঠোর নিয়মকানুন থাকলেও, ভারতে প্রায়শই তা মানা হয় না। এর উদাহরণস্বরূপ ২০০১ সালের গুজরাটের ভুজ ভূমিকম্পের কথা বলা যায়, যেখানে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছিল। ২০১৫ সালের নেপালের ভূমিকম্পেও ক্ষতির পরিমাণ ছিল ৭ বিলিয়ন ডলার। এর বিপরীতে, জাপানের মতো দেশে একই মাত্রার ভূমিকম্প হলেও ক্ষতির পরিমাণ অনেক কম হয়, কারণ সেখানে ভূমিকম্প সহনীয় ভবন নির্মাণে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়।
মায়ানমারের সাম্প্রতিক ভূমিকম্প ভারতের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। হিমালয় অঞ্চলে বড় ধরনের ভূমিকম্পের ঝুঁকি ক্রমশ বাড়ছে, এবং এই বিষয়ে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। ভবন নির্মাণে কঠোর নিয়মকানুন পালন এবং ভূমিকম্প মোকাবিলার প্রস্তুতি জোরদার করাই এখন প্রধান কাজ।