“অন্যায্য বাণিজ্য ভারসাম্য থেকে রেহাই পাবেন না কেউই”- ফের হুঁশিয়ারি ডোনাল্ড ট্রাম্পের

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, অন্যায্য বাণিজ্য ভারসাম্য থেকে কোনো দেশই রেহাই পাবে না। যেসব দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে, তাদের ওপর আরও শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন তিনি।

এর আগে, গত শুক্রবার হোয়াইট হাউস চীন থেকে স্মার্টফোন ও কম্পিউটার আমদানির ওপর আরোপিত শুল্ক প্রত্যাহার করে নেয়। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প এই পদক্ষেপকে সাময়িক এবং নতুন করে শুল্ক আরোপের কৌশল হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

অন্যদিকে, চীনা কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে শুল্ক সম্পূর্ণভাবে বাতিলের আহ্বান জানিয়েছেন। তারা যুক্তরাষ্ট্রকে ‘ভুল সংশোধনে বড় পদক্ষেপ’ নেওয়ার অনুরোধ করেছেন। এই প্রেক্ষাপটে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ‘উৎপাদন কেন্দ্র’ ভিয়েতনাম সফরে গেছেন এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা আরও জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছেন।

ভিয়েতনামের একটি স্থানীয় পত্রিকায় লেখা নিবন্ধে শি জিনপিং চীন ও ভিয়েতনামকে বন্ধুত্বপূর্ণ সমাজতান্ত্রিক প্রতিবেশী হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যারা একই আদর্শ ও কৌশলগত স্বার্থের অংশীদার। তিনি তার পূর্বের মন্তব্যের পুনরাবৃত্তি করে বলেন, বাণিজ্য যুদ্ধ ও শুল্ক যুদ্ধ কারও জন্যই লাভজনক নয় এবং সুরক্ষাবাদ দিয়ে কোনো ইতিবাচক ফল আশা করা যায় না। তবে তিনি সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের নাম উল্লেখ করেননি।

প্রযুক্তি শুল্ক প্রত্যাহারের পর চীনা বাজার:

যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি পণ্যের ওপর শুল্ক প্রত্যাহারের পর চীন ও হংকংয়ের শেয়ার বাজারে ইতিবাচক প্রভাব দেখা গেছে। এছাড়াও, এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য স্থানে, বিশেষ করে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার আর্থিক বাজারে সোমবার সকাল নাগাদ শেয়ারের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে।

চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্তের পর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার করার চেষ্টা করছেন। পাশাপাশি, বৈশ্বিক বাণিজ্যে চীনা সস্তা পণ্যের আধিপত্য বিস্তারের আশঙ্কায় যে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে, সে বিষয়েও তিনি আঞ্চলিক নেতাদের আশ্বস্ত করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সিঙ্গাপুরে বাণিজ্য যুদ্ধের প্রভাব:

চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য যুদ্ধের প্রভাব মোকাবিলায় সিঙ্গাপুরের কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের মুদ্রা নীতি কিছুটা শিথিল করেছে। দেশটির আর্থিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রপ্তানি নির্ভর দেশ হওয়ায় শুল্ক আরোপের কারণে তাদের পণ্যের দাম কমানোর জন্য চাপের মুখে পড়তে হবে। সিঙ্গাপুরের অর্থনীতি বাণিজ্য যুদ্ধের জন্য বিশেষভাবে সংবেদনশীল, কারণ দেশটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপরিবহন কেন্দ্র এবং চীন ও পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যে কৌশলগত অবস্থানে রয়েছে। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে সিঙ্গাপুরের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৮ শতাংশ হয়েছে, যা আগের তিন মাসে ৫ শতাংশ ছিল।

ট্রাম্প কি লক্ষ্য অর্জন করেছেন?

ডোনাল্ড ট্রাম্প এর আগে বিভিন্ন দেশের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ তুলে সমালোচনা করেছেন। হোয়াইট হাউস এখন জানিয়েছে, বিশ্ব নেতারা আলোচনার জন্য ইতিমধ্যেই সম্মত হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ শুল্ক আরোপের আগে অনেক বাণিজ্য অংশীদার সমঝোতায় পৌঁছানোর জন্য ৯০ দিনের সময় পেয়েছিল।

শুল্ক আরোপের পদক্ষেপের কারণে ব্যবসায়ীদের জন্য চূড়ান্ত শুল্কের স্তর এবং কোন শিল্প সবচেয়ে বেশি সুরক্ষা পাবে, তা অনুমান করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ব্যবসায়ীরা বড় কোনো বিনিয়োগের আগে বিষয়টি কীভাবে মীমাংসা হয়, তা দেখার জন্য অপেক্ষা করছেন।

ট্রাম্প দাবি করেছেন, তার বাণিজ্য নীতি ক্রেতাদের কম দামে পণ্য পেতে সাহায্য করবে। তবে অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করেন, এর ফলে পণ্যের দাম আরও বাড়তে পারে।

উল্লেখ্য, ডোনাল্ড ট্রাম্প গত ৯ এপ্রিল থেকে চীনা পণ্য আমদানির ওপর ১০০ শতাংশের বেশি শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন। এর প্রতিক্রিয়ায় চীনের অর্থ মন্ত্রণালয় সব ধরনের মার্কিন পণ্যের ওপর ৮৪ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা করেছে। গত বছর এই দুই অর্থনৈতিক পরাশক্তির মধ্যে প্রায় ৫৮ হাজার ৫০০ কোটি ডলার মূল্যের পণ্য বাণিজ্য হয়েছে। চীন যুক্তরাষ্ট্র থেকে যে পরিমাণ পণ্য আমদানি করেছে, তার তুলনায় যুক্তরাষ্ট্র চীন থেকে অনেক বেশি পণ্য আমদানি করেছে। হিসাব অনুযায়ী, গত বছর চীন থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ৪৪ হাজার কোটি ডলার মূল্যের পণ্য আমদানি হয়েছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র থেকে চীনে আমদানি হয়েছে ১৪ হাজার ৫০০ কোটি ডলার মূল্যের পণ্য। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে বিশ্ব অর্থনীতির প্রায় ৪৩ শতাংশই নিয়ন্ত্রণ করে এই দুটি দেশ—মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীন।

সূত্র: বিবিসি বাংলা