বিশেষ: চৈত্র সংক্রান্তিতে ‘পাঁচন’ খাওয়ার রীতি কেন জানেন?-জেনেনিন বিশেষ রান্নার পদ্ধতি

বাঙালির বিভিন্ন পার্বণের মধ্যে নববর্ষ যেমন একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসব, তেমনই বছরের শেষ দিনের সঙ্গেও জড়িয়ে রয়েছে নানা ঐতিহ্যপূর্ণ রীতিনীতি ও আচার। আজ, ১৪ই এপ্রিল, চৈত্র সংক্রান্তি। এই দিনে পূর্ববঙ্গের অর্থাৎ ‘বাঙাল’ বাড়িতে বিশেষভাবে পালিত হয় পাঁচন তৈরির প্রথা। টক, ঝাল, নোনতা, মিষ্টি ও তেতো—এই পাঁচ স্বাদের মিশ্রণে তৈরি হয় ঐতিহ্যবাহী এই পদ। রকমারি সবজি, শাক, বীজ ও ডাল দিয়ে приготовленный এই খাবারটি যেমন সুস্বাদু, তেমনই এর পুষ্টিগুণও অনেক।
পূর্ববঙ্গীয়দের নিজস্ব রীতি
কর্মব্যস্ততার কারণে বর্তমানে এই রীতিনীতি কিছুটা শিথিল হলেও, শহরতলি ও গ্রামাঞ্চলে এখনও চৈত্র সংক্রান্তি ব্যাপকভাবে উদযাপিত হয়। তবে পাঁচন মূলত পূর্ববঙ্গীয়দের ঐতিহ্য। বিশেষভাবে উল্লেখ্য, বাংলাদেশের সকল বংশোদ্ভূত মানুষজন এই প্রথা পালন করেন না; এটি মূলত ওপার বাংলার নির্দিষ্ট কিছু জেলার রীতি। অন্যদিকে, পশ্চিমবঙ্গের আদি বাসিন্দারা সাধারণত এই প্রথা অনুসরণ করেন না।
পাঁচন খাওয়ার তাৎপর্য
পাঁচন খাওয়ার রীতির অন্তর্নিহিত ব্যাখ্যাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। জীবনের চলার পথে আসা মিষ্টি, টক ও তেতো—সব ধরনের অভিজ্ঞতাকে গ্রহণ করে নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর প্রতীক হল এই পদ। মনে করা হয়, চৈত্র মাসের তীব্র গরমে শরীরকে সুস্থ রাখতে সব স্বাদের সংমিশ্রণে তৈরি পাঁচন বিশেষভাবে উপকারী। আসুন জেনে নেওয়া যাক এই বিশেষ পদের সহজ রেসিপি।
পাঁচন তৈরির উপকরণ:
এঁচোড় – ৫০০ গ্রাম
কুমড়ো – ৫০০ গ্রাম
ঝিঙে – ২-৩টি
আলু – ১ কেজি
কাঁচকলা – ২টি
রাঙাআলু – ৫০০ গ্রাম
বরবটি – ২০০ গ্রাম
উচ্ছে – ১০০ গ্রাম
সজনে ডাঁটা – ২৫০ গ্রাম
মুলো – ২৫০ গ্রাম
কুমড়োর ডাঁটা – ১ আঁটি
কাঁচা পেঁপে – ১টি
সিমের দানা – ১০০ গ্রাম
কাঁচালঙ্কা – ৮-৯টি
তেজপাতা – ৩-৪টি
শুকনো লঙ্কা – ৩-৪টি
পাঁচ ফোড়ন – আধ চা চামচ
আদা বাটা – আধ চা চামচ
হলুদ গুঁড়ো – পরিমাণ মতো
ধনে গুঁড়ো – ১ চা চামচ
নারকেল বাটা – আধ মালা
নুন – পরিমাণ মতো
চিনি – পরিমাণ মতো
সর্ষের তেল – পরিমাণ মতো
পাঁচন তৈরির প্রণালী:
প্রথমে এঁচোড় ও পেঁপে ডুমো করে কেটে সামান্য নুন ও হলুদ গুঁড়ো মিশিয়ে সিদ্ধ করে নিন। সিদ্ধ হয়ে গেলে জল ঝরিয়ে আলাদা করে রাখুন।
আলু ও উচ্ছে ছোট ছোট টুকরো করে কেটে ভেজে তুলে রাখুন।
সিমের দানা শুকনো খোলায় হালকা ভেজে নরম করে সিদ্ধ করে নিন এবং খোসা ছাড়িয়ে রাখুন।
এরপর কড়াইতে তেল গরম করে শুকনো লঙ্কা, তেজপাতা ও পাঁচ ফোড়ন যোগ করুন।
সুন্দর গন্ধ বের হলে আলু, উচ্ছে ও এঁচোড় বাদে বাকি সমস্ত সবজি (কুমড়ো, ঝিঙে, কাঁচকলা, রাঙাআলু, বরবটি, সজনে ডাঁটা, মুলো, কুমড়োর ডাঁটা, কাঁচা পেঁপের টুকরো) কড়াইতে দিয়ে নুন ও হলুদ মিশিয়ে ভালোভাবে নেড়েচেড়ে চাপা দিয়ে মাঝারি আঁচে ১২-১৫ মিনিট সিদ্ধ হতে দিন। খেয়াল রাখবেন, মাঝে মাঝে নাড়াচাড়া করতে হবে এবং আঁচ কমিয়ে রাখতে হবে যাতে সবজি পুড়ে না যায়।
সবজি কিছুটা নরম হয়ে এলে সিদ্ধ করা এঁচোড়, নারকেল বাটা এবং অন্যান্য মশলা (আদা বাটা, হলুদ গুঁড়ো, ধনে গুঁড়ো) দিয়ে ভালোভাবে কষাতে থাকুন।
৪-৫ মিনিট ভালোভাবে কষানো হয়ে গেলে প্রয়োজন অনুযায়ী জল যোগ করুন।
সব সবজি ভালোভাবে সিদ্ধ হয়ে গেলে ভেজে রাখা আলু, উচ্ছে ও সিদ্ধ করা সিমের দানা কড়াইতে মিশিয়ে নিন।
এরপর নুন, মিষ্টি ও ঝাল চেখে দেখুন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী যোগ করুন।
সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে কড়াই থেকে নামিয়ে নিন।
ব্যস, আপনার ঐতিহ্যবাহী পাঁচন সম্পূর্ণ প্রস্তুত! এটি একটু ঠান্ডা করে ভাত বা রুটির সঙ্গে পরিবেশন করুন। এই বিশেষ পদটি যেমন সুস্বাদু, তেমনই স্বাস্থ্যকরও বটে।