‘’পশ্চিমবঙ্গে যোগ্যরা চাকরিহারা আর হিন্দুরা বাস্তুহারা’’ মুর্শিদাবাদে অশান্তি ও SSC-দুর্নীতিতে মমতাকে তুলোধোনা শুভেন্দুর !

পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে সাম্প্রতিক সাম্প্রদায়িক অশান্তি এবং ২০১৬ সালের স্কুল সার্ভিস কমিশন (এসএসসি) নিয়োগে ব্যাপক দুর্নীতির ঘটনায় রাজ্য সরকারকে তীব্র আক্রমণ করলেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। গতকাল কলকাতায় কলেজ স্কোয়ার থেকে ধর্মতলা পর্যন্ত ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) এক বিশাল বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নিয়ে শুভেন্দু অধিকারী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদত্যাগ দাবি করেন।
মিছিলে শুভেন্দু অধিকারী ছাড়াও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও রাজ্য বিজেপি সভাপতি সুকান্ত মজুমদার সহ অন্যান্য শীর্ষ নেতৃত্ব উপস্থিত ছিলেন। বিজেপির অভিযোগ, রাজ্য সরকারের তোষণ নীতি এবং ব্যাপক দুর্নীতির কারণে একদিকে যেমন হিন্দু সম্প্রদায় তাদের ভিটেমাটি হারাচ্ছে, তেমনই অন্যদিকে যোগ্য প্রার্থীরাও তাদের ন্যায্য চাকরি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
মুর্শিদাবাদ জেলায় সম্প্রতি ওয়াকফ (সংশোধনী) আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের নামে ভয়াবহ সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। এই ঘটনায় তিনজন নিরীহ মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং শতাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন। পুলিশ সূত্রে খবর, জঙ্গিপুর, সুতি এবং শমশেরগঞ্জ এলাকায় বিক্ষোভকারীরা পুলিশের উপর নির্বিচারে পাথর ছুঁড়েছে, একাধিক গাড়িতে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা অবরোধ করেছে। এই ঘটনায় ইতিমধ্যেই ১৫০ জনেরও বেশি ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী এই সহিংসতার তীব্র নিন্দা করে দাবি করেছেন যে, এর ফলে ধুলিয়ান এলাকা থেকে প্রায় ৪০০-এর বেশি হিন্দু পরিবার প্রাণের ভয়ে নদী পেরিয়ে মালদহের বৈষ্ণবনগরের দেওনাপুর-শোভাপুর গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। তিনি বলেন, “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্লজ্জ তোষণ নীতি জেহাদি উপদ্রবকে উৎসাহিত করেছে, যার ফলস্বরূপ হিন্দুরা আজ নিজেদের দেশেই উদ্বাস্তুতে পরিণত হচ্ছেন।”
কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশে বর্তমানে মুর্শিদাবাদে কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী (সিএপিএফ) মোতায়েন করা হয়েছে। আদালত পরিস্থিতিকে “গুরুতর এবং অস্থিতিশীল” বলে অভিহিত করে রাজ্য পুলিশের চরম ব্যর্থতার সমালোচনা করেছে। বিজেপি নেতারা এই রায়কে রাজ্য সরকারের “অযোগ্যতার চূড়ান্ত প্রমাণ” হিসেবে উল্লেখ করেছেন। শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার সম্পূর্ণরূপে নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। কেবলমাত্র একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে খুশি করার জন্য তারা কঠোর পদক্ষেপ নিতে দ্বিধা করেছে, যার কারণে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ক্রমশ বৃদ্ধি পেয়েছে।”
বিজেপির পক্ষ থেকে আরও অভিযোগ করা হয়েছে যে, সহিংসতার সময় হিন্দুদের দোকানপাট লুট করা হয়েছে, একাধিক মন্দির ভাঙচুর করা হয়েছে এবং দুর্ভাগ্যজনকভাবে পুলিশ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে। রাজ্য বিজেপি সভাপতি সুকান্ত মজুমদার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কার্যত রাজ্যকে জেহাদিদের হাতে তুলে দিয়েছেন। এই ভয়াবহ পরিস্থিতি আর কোনোভাবেই সহ্য করা যায় না।” তিনি আরও দৃঢ়ভাবে বলেন, “যদি বিজেপি আগামী দিনে ক্ষমতায় আসে, তাহলে এই ধরনের সহিংসতা পাঁচ মিনিটের মধ্যেই কঠোর হাতে দমন করা হবে।”
অন্যদিকে, ২০১৬ সালের এসএসসি নিয়োগে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগে সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক নির্দেশে প্রায় ২৬,০০০ শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীর চাকরি বাতিল হয়েছে। দেশের শীর্ষ আদালত স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ওএমআর শিটে ব্যাপক কারচুপি করা হয়েছে, জাল মেধাতালিকা তৈরি করা হয়েছে এবং মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে অযোগ্য প্রার্থীদের চাকরি দেওয়া হয়েছে। এই রায়ের ফলে রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থায় এক বড়সড় ধাক্কা লেগেছে। বিজেপি সরাসরি অভিযোগ করেছে যে, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় এই ভয়াবহ দুর্নীতি সংঘটিত হয়েছে।
শুভেন্দু অধিকারী এই প্রসঙ্গে আরও বলেন, “এত বড় আকারের দুর্নীতি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সক্রিয় সমর্থন ছাড়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আদালত বারবার যোগ্য এবং অযোগ্য প্রার্থীদের তালিকা আলাদা করার সুস্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছিল, কিন্তু রাজ্য সরকার রহস্যজনকভাবে তা পালন করেনি। এর প্রধান কারণ হল, যদি সেই তালিকা প্রকাশ করা হত, তাহলে তৃণমূলের বহু প্রভাবশালী নেতার দুর্নীতির পর্দা ফাঁস হয়ে যেত। ফলস্বরূপ, বহু যোগ্য প্রার্থী আজ তাদের ন্যায্য চাকরি হারাতে বাধ্য হয়েছেন।” তিনি আরও অভিযোগ করেন, “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর আত্মীয়রাই এই দুর্নীতির প্রধান সুবিধাভোগী। নিজেদের অপকর্ম ঢাকতে এবং নিজেদের বাঁচাতে তারা বহু যোগ্য প্রার্থীর জীবন কেড়ে নিয়েছেন।”
বাতিল হওয়া চাকরির মধ্যে বহু এমন যোগ্য প্রার্থীও রয়েছেন, যাঁরা দীর্ঘ এবং কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে লিখিত পরীক্ষা ও ইন্টারভিউতে সাফল্যের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ প্রার্থীরা ইতিমধ্যেই রাজ্যজুড়ে তীব্র বিক্ষোভ শুরু করেছেন। কলকাতা, মালদহ, হুগলি, বালুরঘাট, তমলুক এবং কৃষ্ণনগরের জেলা পরিদর্শক (ডিআই) অফিসে বিক্ষোভকারীরা দফায় দফায় হামলা চালিয়েছেন, তালা ভেঙেছেন এবং গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা অবরোধ করে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। একজন প্রতিবাদী শিক্ষক অভিজিৎ ব্যাপারী ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, “আমরা অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে আমাদের দায়িত্ব পালন করেছি। আমাদের কোনো প্রকার দোষ না থাকা সত্ত্বেও আজ আমরা চাকরি হারাতে বসেছি। এটা রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থার চরম ধ্বংসের ইঙ্গিত।”
গতকালকের বিক্ষোভ মিছিলে বিজেপি নেতারা মুর্শিদাবাদের ভয়াবহ সহিংসতা এবং এসএসসি নিয়োগে ব্যাপক দুর্নীতি – এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে একত্রিত করে রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানান। শুভেন্দু অধিকারী দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেন, “পশ্চিমবঙ্গে আজ যোগ্য প্রার্থীরা চাকরিহারা এবং হিন্দুরা তাদের নিজেদের ভিটেমাটি থেকে বাস্তুহারা। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারই এই দুটি গভীর সংকটের জন্য সম্পূর্ণরূপে দায়ী। তিনি কোনোভাবেই এর নৈতিক দায় এড়াতে পারেন না। এই সমস্যার একমাত্র সমাধান হল তাঁর অবিলম্বে পদত্যাগ।” তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে “চাকরি চোর” এবং “হিন্দু হত্যাকারী” সরকারের প্রধান হিসেবে তীব্র কটাক্ষ করেন।
সুকান্ত মজুমদারও একই সুরে বলেন, “মুর্শিদাবাদে হিন্দুদের উপর বর্বরোচিত হামলা এবং রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থার এই চরম ধ্বংস – এই দুটি ঘটনাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শাসনের চূড়ান্ত ব্যর্থতার জ্বলন্ত প্রমাণ। তিনি আর এক মুহূর্তের জন্যেও রাজ্য চালানোর যোগ্য নন।” বিজেপি আরও অভিযোগ করেছে যে, রাজ্য সরকারের ইচ্ছাকৃত বিলম্ব এবং তোষণ নীতির কারণেই রাজ্যে সহিংসতা আরও ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। পুরুলিয়ার বিজেপি সাংসদ জ্যোতির্ময় সিংহ মাহাতো ইতিমধ্যেই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের কাছে একটি জরুরি চিঠি লিখে মুর্শিদাবাদ, মালদহ, নদিয়া এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনার স্পর্শকাতর এলাকায় সশস্ত্র বাহিনী (বিশেষ ক্ষমতা) আইন (এএফএসপিএ) জারির জোরালো দাবি জানিয়েছেন।
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অবশ্য মুর্শিদাবাদের সহিংসতার জন্য সরাসরি কেন্দ্রীয় সরকারকে দায়ী করেছেন। তিনি বলেছেন, “ওয়াকফ আইন সম্পূর্ণরূপে কেন্দ্রের তৈরি। আমরা এই আইনকে কোনোভাবেই সমর্থন করি না এবং আমাদের রাজ্যে এটি কার্যকর করতে দেব না।” তিনি রাজ্যের সকল নাগরিককে শান্তি বজায় রাখার জন্য আবেদন জানিয়েছেন। এসএসসি দুর্নীতি প্রসঙ্গে তিনি যোগ্য প্রার্থীদের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করলেও কোনো সুস্পষ্ট পদক্ষেপের কথা এখনও পর্যন্ত জানাননি।
মুর্শিদাবাদের সাম্প্রতিক সহিংসতা এবং এসএসসি নিয়োগে ব্যাপক দুর্নীতি – এই দুটি ঘটনাই পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিজেপির লাগাতার বিক্ষোভ এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদত্যাগের জোরালো দাবি রাজ্যের রাজনৈতিক উত্তাপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। বাস্তুচ্যুত হিন্দু পরিবার এবং চাকরি হারানো হাজার হাজার শিক্ষকের ভবিষ্যৎ এখন গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে। এই সংকটময় পরিস্থিতি সামাল দিতে রাজ্য সরকার শেষ পর্যন্ত কী পদক্ষেপ নেয়, তা আগামী দিনে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করার বিষয়।