“মনের গভীরে তীব্র কষ্ট”-নিয়েই এখনও স্কুুলে যাচ্ছেন, পরীক্ষার খাতাও দেখছেন দুই চাকরিহারা

মনের গভীরে তীব্র কষ্ট, গলার কাছে দলা পাকানো কান্না, অজান্তেই চোখ ছলছল করছে। তবুও শিরদাঁড়া সোজা, মাথা উঁচু করে এখনও স্কুলে যাচ্ছেন তাঁরা। নিয়মিত ক্লাস নিচ্ছেন, পরীক্ষার গার্ড দিচ্ছেন, খাতা দেখছেন।
ওঁরা সুদেষ্ণা ভক্তা ও অদিতি চক্রবর্তী। পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার শালবনি নিচমঞ্জরি হাইস্কুলের জীবন বিজ্ঞান ও বাংলার শিক্ষিকা। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ৩ এপ্রিল রাজ্যের প্রায় ২৬ হাজার শিক্ষক-শিক্ষিকার মতো তাঁদেরও চাকরি গিয়েছে। আদালতের নির্দেশ শোনার পরেই অনেক চাকরিহারা শিক্ষক-শিক্ষিকা স্কুল ছেড়ে গেলেও, এই দু’জন শুরু থেকেই ব্যতিক্রমী। তাঁরা নিয়মিত স্কুলে যাচ্ছেন, হাজিরা খাতায় সই করছেন এবং এই কঠিন পরিস্থিতিতেও মাথা উঁচু করে নিজেদের কর্তব্য পালন করে চলেছেন।
জীবন বিজ্ঞানের শিক্ষিকা সুদেষ্ণা ভক্তা বলেন, ‘স্কুল যাতায়াতের পথে রাস্তায়, বাসে আমাদের মতো শিক্ষক-শিক্ষিকাদের নিয়ে নানা আলোচনা শুনি। তবে আমাদের সরাসরি কেউ কিছু বলেনি। আমি স্কুলে যাচ্ছি। ক্লাসও করছি।’ সহকর্মী অদিতির কথায়, ‘মেয়েদের খাতা দেখার সময়ে মাঝে মাঝে বুকটা যন্ত্রণায় মোচড় দিয়ে উঠছে। তবুও খাতা দেখছি।’
সুদেষ্ণা ও অদিতির স্পষ্ট বক্তব্য, ‘আমাদের যোগ্য বিবেচনা করেই নিয়োগপত্র দিয়েছিল এসএসসি ও মধ্যশিক্ষা পর্ষদ। যতদিন না সেখান থেকে কোনও সুস্পষ্ট নির্দেশ আসে, ততদিন আমরা স্কুলে যাব।’ তবে আজ, সোমবার তাঁরা স্কুলে যাবেন না। এদিন তাঁরা কলকাতায় নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা শুনতে যাবেন। সুযোগ পেলে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে সরাসরি কথাও বলবেন।
মুখ্যমন্ত্রীর কাছে তাঁরা কী বলবেন? সেই প্রশ্নের উত্তরে সুদেষ্ণা ও অদিতি জানান, ‘মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকে শুধু প্রথম বিভাগ নয়, স্টার মার্কস পেয়ে পাশ করেছিলাম। স্নাতক, স্নাতকোত্তর থেকে বিএড – সব জায়গাতেই প্রথম শ্রেণি পেয়েছি। মধ্যবিত্ত পরিবারে বহু কষ্টে পড়াশোনা করে এই সুযোগ পেয়েছিলাম। আমাদের চাকরি গেল কেন? কী ভাবে সারাটা জীবন কাটাব?’
অদিতি গভীর উদ্বেগের সঙ্গে বলেন, ‘আমার ছেলের বয়স এখন সাড়ে দশ মাস। কী ভাবে ওকে মানুষ করব?’ আর সুদেষ্ণা বলেন, ‘বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান আমি। তাঁরা দু’জনেই নানা রোগে ভুগছেন। প্রতি মাসে কয়েক হাজার টাকার ওষুধ লাগে। আগে প্রাইভেট টিউশন দিয়েও সংসার চালিয়েছি। আর এখন কী করব, ভাবতেই পারছি না। তাঁরা যে আমার উপরেই নির্ভরশীল। এই অসহায়তার কথাই জানাব মুখ্যমন্ত্রীকে।’
স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা বাসবী ভাওয়ালও অকুণ্ঠভাবে স্বীকার করছেন যে দু’জন শিক্ষিকাই অত্যন্ত ভালো পড়ান এবং ছাত্রীদের কাছেও তাঁরা অত্যন্ত প্রিয়। তিনি বলেন, ‘সুদেষ্ণা তো পড়ানোর পাশাপাশি কন্যাশ্রীর বিষয়টি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে দেখতেন। মেয়েদের বাল্যবিবাহ ও টিনেজ প্রেগন্যান্সির কুফল সম্পর্কে সচেতন করতেন। যেহেতু শিক্ষা দফতর থেকে ওঁদের স্কুলে আসা নিয়ে কোনও স্পষ্ট নির্দেশ আসেনি, তাই আমিও কিছু বলিনি। ওঁরা আসছেন, হাজিরা খাতায় সই করছেন এবং নিয়মিত পঠন-পাঠনের কাজ করছেন।’
ছাত্রীদের সঙ্গে কথা বললেই বোঝা যায় শিক্ষিকারা তাদের কতটা ভালোবাসেন। দশম শ্রেণির ছাত্রী মাম্পি মণ্ডল ও নবম শ্রেণির সুপ্রিয়া সোরেন এখনও পুরোপুরি বুঝতে পারেনি যে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে তাঁদের প্রিয় দুই শিক্ষিকাকে স্কুল ছাড়তে হতে পারে। তাদের সরল স্বীকারোক্তি, ‘দুই ম্যাম এত ভালো পড়ান যে ক্লাসেই সবটা বুঝে যাই। পড়ানোর পাশাপাশি আমাদের ভীষণ ভালোবাসেন।’
কিন্তু যদি কোনও দিন তাঁদের স্কুল ছেড়ে চলে যেতে হয়? এই প্রশ্ন শুনেই মাম্পির চোখে জল চিকচিক করে ওঠে। ধরা গলায় সে বলে, ‘ভীষণ কষ্ট হবে। এটা ভাবতেই পারছি না।’