গরুর লাথিতে নষ্ট হয়ে যায় চোখ, কিভাবে শুরু কিডনি কারবার? উঠে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য

প্রথমে চড়া সুদে ঋণ দেওয়া, তারপর সেই ঋণের জন্য লাগাতার চাপ সৃষ্টি করা। সুদের জালে জড়িয়ে কেউ যখন নিঃস্ব হয়ে যেতেন, ঠিক তখনই চাপ দিয়ে তার বা তার পরিবারের কোনো সদস্যের কিডনি অবৈধভাবে বিক্রি করে দেওয়া – এটাই ছিল অশোকনগরের ভয়ঙ্কর কিডনি পাচার চক্রের মূল পরিকল্পনা। এই চক্রের তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই লোমহর্ষক তথ্য সামনে আসছে।
এই চক্রে সুদের ফাঁদ পেতে কিডনি বিক্রির জন্য চাপ দিত যে ব্যক্তি, সেই বিকাশ ঘোষ ওরফে শীতল অবশেষে পুলিশের জালে ধরা পড়েছে। তার গ্রেফতারির পরই তার কুকর্মের একের পর এক নিদর্শন উন্মোচিত হচ্ছে। কিন্তু শীতল কীভাবে এই কিডনি পাচার চক্রের অন্যতম প্রধান মাথা হয়ে উঠল? তার পেছনের কাহিনীও চমকে দেওয়ার মতো।
তদন্তে জানা গেছে, কোভিড-১৯ মহামারীর আগে শীতল গরুর দুধ বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করত। কোভিডের সময় একটি দুর্ঘটনায় গরুর লাথি লেগে তার একটি চোখ নষ্ট হয়ে যায়। রাগের বশে সে নাকি তার পালিত গরু বিক্রি করে দেয়। এরপরই তার জীবনের মোড় ঘুরে যায়। তখন কোভিড পরিস্থিতি, বহু মানুষের আর্থিক অনটন। গরু বিক্রির টাকা দিয়ে শীতল সুদের ব্যবসা শুরু করে। এই কারবারের মাধ্যমেই অল্প সময়ের মধ্যে সে প্রচুর টাকা রোজগার করতে শুরু করে এবং বিলাসবহুল জীবনযাপন করতে থাকে।
অশোকনগর থানা দীর্ঘদিন ধরেই এই কিডনি পাচার চক্রের পর্দা উন্মোচনের জন্য তদন্ত চালাচ্ছিল। অশোকনগরের বাসিন্দা রাজীব দাস নামক এক ব্যক্তির অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ তদন্ত শুরু করে। রাজীব লকডাউনের সময় শীতলের কাছ থেকে টাকা ধার করেছিলেন এবং চড়া সুদের হারে ঋণের জালে জড়িয়ে পড়েন। নিজের ভ্যান বিক্রি করে এবং সমস্ত সঞ্চয় ভেঙেও তিনি দেনা পরিশোধ করতে পারছিলেন না। এরপরই শীতল রাজীবের স্ত্রীর কিডনি বিক্রি করার জন্য চাপ দেয়। রাজীব একা নন, ওই এলাকার আরও অনেকেই শীতলের পাতা ফাঁদে পা দিয়েছিলেন। প্রথমে চড়া সুদের কারবারের অভিযোগের তদন্ত শুরু হলেও, ধীরে ধীরে কিডনি পাচার চক্রের ভয়াবহতা সামনে আসে।
তদন্তে এই চক্রের অন্যতম পান্ডা গুরুপদ জানা ওরফে অমিতের সঙ্গে সল্টলেকের একটি নেফ্রোলজি সেন্টারের যোগসূত্র পাওয়া গেছে বলে খবর। তদন্তকারীরা জানতে পেরেছেন, ধৃত অমিতের সঙ্গে ওই সেন্টারের এক কর্মীর নিয়মিত হোয়াটসঅ্যাপে কথোপকথন হতো। অমিতকে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ এখন সল্টলেকের ওই নেফ্রোলজি সেন্টারের কর্মীকেও জেরা করতে চাইছে।
তদন্তে আরও জানা গেছে, জেলায় কিডনি দানের জন্য আসা আবেদনগুলির মধ্যে যেগুলি প্রাথমিকভাবে ‘নট রেকমেন্ডেড’ হত, সেগুলি পরবর্তীতে রাজ্য স্তর থেকে ‘রেকমেন্ডেড’ হয়ে যেত। কীভাবে এবং কার নির্দেশে এটি ঘটত, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। শীতলের মাথার উপর আর কারা ছিল, তাদেরও সন্ধান চলছে। আপাতত শীতলকে জেরা করে কিডনি পাচার চক্রের মূল হোতাদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন তদন্তকারীরা। এই ভয়াবহ চক্রের জাল কতদূর বিস্তৃত, তা জানতে তদন্তকারী দল বদ্ধপরিকর।