যুক্তরাষ্ট্রের ধাক্কা সামলাতে চীনের দিকে ঝুঁকছে স্যামসাং, বাইদুর সঙ্গে গোপন চুক্তি

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্যামসাংয়ের সেমিকন্ডাক্টর ব্যবসা বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বড় গ্রাহক পেতে হিমশিম খাচ্ছে দক্ষিণ কোরিয়ার এই প্রযুক্তি জায়ান্ট। এই সংকট থেকে মুক্তি পেতে স্যামসাং এখন চীনের প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে জোরদার ব্যবসায়িক সম্পর্ক স্থাপন করছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার কারণে চীন বর্তমানে উন্নত এআই চিপের মজুদ বাড়াতে জোর দিয়েছে।

এই বিষয়ে স্যামসাংয়ের একটি সূত্র জানায়, গত বছর চীনের সার্চ ইঞ্জিন বাইদুর চিপ ডিজাইন শাখা কুনলুনের সঙ্গে একটি গোপন চুক্তি করেছে কোম্পানিটি। চুক্তি অনুযায়ী, গত বছর স্যামসাং চীনা প্রযুক্তি গ্রুপ বাইদুর সেমিকন্ডাক্টর শাখা কুনলুনকে এআই চিপ তৈরির জন্য তিন বছরের বেশি সময়ের জন্য লজিক ডাই (এআই চিপ তৈরির মূল যন্ত্রাংশ) বিক্রি করেছে। এই খবরটি সম্প্রতি ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের এক প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার মুখে চীনের প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো যখন উন্নত এআই চিপের মজুদ বাড়াতে ব্যস্ত, তখন স্যামসাংয়ের এই পদক্ষেপ তাদের সেমিকন্ডাক্টর ব্যবসাকে নতুন করে চাঙা করতে সাহায্য করবে বলে আশা করা যাচ্ছে। যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যেকার ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য উত্তেজনার মধ্যে স্যামসাংয়ের এই ব্যবসায়িক কৌশল কতটা সফল হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

উল্লেখ্য, স্যামসাং গত বছর টেক্সাসে তাদের অত্যাধুনিক চিপ উৎপাদন ও প্যাকেজিং কারখানা সম্প্রসারণে ৪০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা করেছে, যার মধ্যে ৬.৪ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত ফেডারেল ভর্তুকি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে তাদের কন্টাক্ট চিপ তৈরির ব্যবসা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বড় গ্রাহকদের আকৃষ্ট করতে তেমন সুবিধা করতে পারেনি এবং তাইওয়ানের টিএসএমসির কাছে তারা বাজার শেয়ার হারাচ্ছে।

ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে নোমুরার এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের ইক্যুইটি রিসার্চের যুগ্ম প্রধান সিডব্লিউ চুংয়ের মন্তব্য উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি বলেন, “স্যামসাং এবং চীনের একে অপরের প্রয়োজন। চীনা গ্রাহকরা স্যামসাংয়ের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, তবে একসঙ্গে ব্যবসা করা সহজ হবে না।” তিনি আরও বলেন, স্যামসাং ইতিমধ্যেই তাদের স্থানীয় প্রতিদ্বন্দ্বী এসকে হাইনিক্সের থেকে “হাই ব্যান্ডউইথ মেমরি” (এইচবিএম)-এর বাজারে পিছিয়ে পড়েছে, যা এআই চিপের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নিভিদিয়ার প্রধান এইচবিএম সরবরাহকারী হিসেবে এসকে হাইনিক্সের গত ত্রৈমাসিকের পরিচালন মুনাফা প্রথমবারের মতো স্যামসাংয়ের চেয়ে বেশি ছিল।

তবে পরামর্শক সংস্থা সেমিঅ্যানালিসিসের মতে, স্যামসাং এখনও হুয়াওয়ের অ্যাসেন্ড ৯১০ সিরিজের এআই চিপে ব্যবহৃত এইচবিএম-এর “সবচেয়ে বড় সরবরাহকারী”। স্যামসাংয়ের কন্টাক্ট চিপ তৈরির ব্যবসা কুনলুনের সঙ্গে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে কোর পি৮০০ নামে একটি এআই চিপও তৈরি করেছে, যা গত ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত হয়েছে এবং এতে স্যামসাংয়ের এইচবিএম ব্যবহার করা হয়েছে।

স্যামসাংয়ের চিন্তাভাবনা সম্পর্কে অবগত এক ব্যক্তি জানান, কোম্পানিটি কুনলুনের সঙ্গে আরও উন্নত এআই চিপ তৈরির আশা করেছিল, কিন্তু জানুয়ারিতে কার্যকর হওয়া নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে সেই প্রকল্পটি স্থগিত করা হয়েছে। কারণ নতুন নিয়ম অনুযায়ী, বিদেশি ফাউন্ড্রিগুলো চীনের গ্রাহকদের জন্য যে এআই চিপ তৈরি করবে, তার কর্মক্ষমতার একটি নির্দিষ্ট সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। টিএসএমসি গত বছর ভুল করে হুয়াওয়ের পক্ষে কাজ করা শেল কোম্পানিগুলোর জন্য এআই চিপ একত্রিত করার কথা স্বীকার করার পরেই এই নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর করা হয়েছে।

স্যামসাংয়ের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানায়, “জানুয়ারিতে কঠোর মার্কিন রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ কার্যকর হওয়ার পর থেকে বাইদুর সঙ্গে আমাদের ব্যবসা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।” সূত্রটি আরও জানায়, স্যামসাং মার্কিন কর্তৃপক্ষের কাছে আরও ছাড়ের জন্য আবেদন করছে।

ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক বিবৃতিতে স্যামসাং জানিয়েছে, তারা “মার্কিন সরকার কর্তৃক নির্ধারিত রপ্তানি নিয়মাবলী কঠোরভাবে মেনে চলে। আমরা আমাদের গ্রাহকদের সম্পর্কের বিষয়ে মন্তব্য করতে পারছি না।”

তবে বিশ্লেষকদের মতে, স্যামসাংয়ের এই পদক্ষেপ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নীতি নির্ধারকদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করতে পারে এবং ভবিষ্যতে চীনকে উন্নত প্রযুক্তি সরবরাহের ক্ষেত্রে আরও কঠোর পদক্ষেপ দেখা যেতে পারে।