“ফেরত দিতে প্রায় ৩৫ লক্ষ টাকা”-অযোগ্য ছেলের জন্য হাহাকার ভ্যানচালকের

সিবিআইয়ের তদন্তে উঠে এসেছিল, ১২ থেকে ১৪ লক্ষ টাকা দিয়ে চাকরি পাওয়াদের তালিকায় রয়েছে এই যুবকের নাম। পশ্চিম মেদিনীপুরের কেশপুরের বাসিন্দা তিনি। বৃহস্পতিবার খবর আসে, চাকরি আর নেই। ঘরে খিল এঁটে বসেছেন তিনি। যে টাকা দিয়ে চাকরি পেয়েছিলেন, তা ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। উপরন্তু, এতদিন চাকরি করে যে টাকা রোজগার করেছিলেন, সেটাও ফেরত দিতে হবে—প্রায় ৩৫ লক্ষ টাকা।

আর তাঁর বাবা এখন ভ্যান চালান। তিল তিল করে জমানো টাকায় ১২ লক্ষ টাকার সামান্য অংশও হওয়ার কথা ছিল না। হয়ওনি। তাই, ধার করতে হয়েছিল। কিছু টাকা চড়া সুদেও নিয়েছিলেন। আর যা কিছু জমি-জায়গা ছিল, সব বিক্রি করে দেন ছেলের চাকরির জন্য। সম্প্রতি চাকরি বাতিলের আশঙ্কা চেপে বসেছিল। এই সেদিন প্রতিবেশীদের কাছে দুঃখ করে বলছিলেন, ‘ছেলের চাকরিটা চলে গেলে আর খেতে পাব না। ছেলের চাকরির জন্য জমি, জায়গা যা ছিল সব কিছু বিক্রিবাটা করে শেষ করে দিয়েছি। সংসার চালাতে একমাত্র ভরসা ছেলের চাকরিটাই। সেটাও যদি চলে যায়, সুইসাইড করা ছাড়া উপায় নেই!’

আর বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ফোনে ধরা হলে তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘জানি না কী করব! এখন টাকা ফেরত দিতে হলে আমাদের মরে যাওয়া ছাড়া কোনও রাস্তা নেই।’

২০১৬ সালে স্কুল সার্ভিস কমিশন (এসএসসি)-র বিজ্ঞপ্তির ভিত্তিতে চাকরির আবেদন করেছিলেন বহু যুবক-যুবতী। তাঁরা পরীক্ষায় বসে, ইন্টারভিউ দিয়ে চাকরি পেয়েছিলেন। পরে এই নিয়োগ নিয়ে মামলা দায়ের হয়। অভিযোগ ওঠে, যোগ্যদের বঞ্চিত করে ঘুরপথে অযোগ্যদের চাকরি দেওয়া হয়েছে। কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশে তদন্তে নামে সিবিআই। জানা যায়, স্রেফ টাকার বিনিময়ে চাকরি পেয়েছেন অনেকে। নির্দেশ মতো ‘লোক-দেখানো’ পরীক্ষায় ফাঁকা ওএমআর শিট বা উত্তরপত্র জমা দিয়ে এসেছেন তাঁরা। যে দুর্নীতির অভিযোগে রাজ্যের প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় আজও জেলবন্দি।

প্রথমে হাইকোর্ট আর এখন সুপ্রিম কোর্ট সেই বার নিয়োগ হওয়া ২৫ হাজার ৭৫২ শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীরই চাকরি বাতিল করে দিয়েছে। তাঁদের মধ্যে এখনও অযোগ্য বলে চিহ্নিত প্রায় ৬ হাজার ২৭৬ জনকে এতদিন ধরে পাওয়া বেতন ফেরত দেওয়ার নির্দেশও এসেছে। কেশপুরের এই যুবকের নামও সেই তালিকায় রয়েছে। অন্য অনেক অযোগ্য নিজেদের আড়ালে রেখেছেন। কোথাও ঘুণাক্ষরে বলছেন না যে টাকার বিনিময়ে চাকরি পেয়েছেন। কিন্তু, কেশপুরের ভ্যানচালক সাধারণ সাদাসিধে মানুষ। গোপন করেননি টাকার বিনিময়ে তাঁর ছেলের চাকরি পাওয়ার কথা।

তিনি জানিয়েছেন, একজনের মাধ্যমে পরিচয় হয় এক দালালের সঙ্গে। তাঁর মাধ্যমেই নাকি টাকা দিয়ে চাকরি পেয়েছিলেন তাঁর ছেলে। স্থানীয়দের কথায়, এলাকার একজন কলকাতার বিকাশ ভবনে চাকরি করতেন। তাঁর সূত্রেই যোগাযোগ। ওই যুবক নাকি একা নন। ওই এলাকার আরও কয়েকজনও নাকি টাকার বিনিময়ে স্কুল শিক্ষকের চাকরি পেয়েছেন। যাঁর মাধ্যমে টাকা পাঠানো হয়েছিল, সিবিআইয়ের তদন্ত শুরু হতেই তিনি এলাকা ছেড়ে পালান। সূত্রের খবর, একটি পাড়াতেই এমন তিনজন শিক্ষক রয়েছেন—একজন ইতিহাসের, একজন জীবন বিজ্ঞানের এবং আরেক জন গণিতের শিক্ষক।

প্রতিবেশীদের দাবি, চাকরি পাওয়ার পরে এঁদের কাউকে গর্ব করে জনসমক্ষেই বলতে শোনা গিয়েছে, ‘আসল লাইন ধরতে হবে। চাকরি হবে না মানে!’ কেউ তো নিজে চাকরি পাওয়ার পরে অন্যান্যদেরও প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছিলেন। এখন চাকরি হারানোর খবরে তাঁদের সকলের মুখ বন্ধ। কিন্তু কেশপুরের ভ্যানচালক বাবার আর্তনাদ যেন গোটা ব্যবস্থার দিকেই প্রশ্ন ছুঁড়ে দিচ্ছে।