“ব্যক্তিগত গোপনীয়তার লঙ্ঘন”-ফেসবুকে ব্যক্তিগত তথ্যের ব্যবহার বন্ধে আইনি লড়াই তরুণীর

লন্ডনভিত্তিক প্রযুক্তি নীতি ও মানবাধিকার কর্মী তানিয়া ও’ক্যারল ফেসবুক ব্যবহারকারীদের জন্য একটি নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করেছেন। তিনি আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে সোশ্যাল মিডিয়া জায়ান্ট মেটাকে বাধ্য করেছেন তার ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে টার্গেটেড বিজ্ঞাপন প্রচার বন্ধ করতে। এই জয় শুধু তার ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং গোপনীয়তার অধিকার রক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তানিয়া ও’ক্যারল ২০২২ সালে মেটার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। তার অভিযোগ ছিল, ফেসবুক ব্যবহারকারীদের গোপনীয়তা লঙ্ঘন করে তাদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে। এরপর সেই তথ্যের ভিত্তিতে তাদের পছন্দ অনুযায়ী বিজ্ঞাপন প্রদর্শন করে, যা যুক্তরাজ্যের ডাটা সুরক্ষা আইনের (জিডিপিআর) পরিপন্থী। তিনি দাবি করেন, ব্যবহারকারীদের এই ধরনের ডাটা প্রক্রিয়াকরণের বিরুদ্ধে আপত্তি জানানোর অধিকার রয়েছে।
আইসিওর সমর্থন ও মেটার যুক্তি
যুক্তরাজ্যের তথ্য কমিশনারের অফিস (আইসিও) তানিয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়ে জানিয়েছে, অনলাইন টার্গেটেড বিজ্ঞাপনকে সরাসরি বিপণনের (ডাইরেক্ট মার্কেটিং) অংশ হিসেবে গণ্য করা উচিত। আইসিওর মতে, ব্যবহারকারীদের তথ্য এভাবে ব্যবহারের ক্ষেত্রে তাদের স্পষ্টভাবে আপত্তি জানানোর সুযোগ থাকতে হবে। অন্যদিকে, মেটা দাবি করেছে, তাদের বিজ্ঞাপন ব্যবস্থা ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে না, বরং ন্যূনতম ১০০ জনের গ্রুপকে টার্গেট করে। তাই এটি সরাসরি বিপণনের আওতায় পড়ে না। তবে আইসিও মেটার এই ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করেছে।
ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে লড়াই
তানিয়া ও’ক্যারলের এই আইনি লড়াইয়ের পেছনে রয়েছে তার নিজের অভিজ্ঞতা। ২০১৭ সালে তিনি গর্ভবতী হওয়ার পর তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে হঠাৎ মাতৃত্ব ও শিশুসংক্রান্ত বিজ্ঞাপন দেখা যেতে শুরু করে। অথচ তিনি তখনও তার গর্ভধারণের কথা কারও সঙ্গে শেয়ার করেননি। এই ঘটনা তার কাছে অস্বস্তিকর ও গোপনীয়তার লঙ্ঘন বলে মনে হয়। তিনি বলেন, “এটি আমার জন্য একটি জাগরণের মুহূর্ত ছিল। আমি বুঝতে পারি, ফেসবুক আমার সম্পর্কে এমন তথ্য জানে, যা আমি নিজে প্রকাশ করিনি।”
মেটার সমঝোতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর মেটা সম্প্রতি তানিয়ার দাবি মেনে নিয়ে তার ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে টার্গেটেড বিজ্ঞাপন প্রচার বন্ধ করতে সম্মত হয়েছে। তানিয়া জানান, “আমি এখন ফেসবুকে সমস্ত টার্গেটেড বিজ্ঞাপন বন্ধ করতে পেরেছি। তবে আমি ফেসবুক ছাড়তে চাই না, কারণ এটি আমার পরিবার, বন্ধু ও জীবনের গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতির সঙ্গে জড়িত।” তিনি এটিকে তার এবং গোপনীয়তার অধিকারে বিশ্বাসী সবার জন্য একটি জয় হিসেবে দেখছেন।
মেটা এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা তানিয়ার দাবির সঙ্গে মূলত দ্বিমত পোষণ করে। তাদের মতে, বিজ্ঞাপনের মাধ্যমেই ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্ম বিনামূল্যে ব্যবহারকারীদের জন্য উন্মুক্ত থাকে। তবে তারা যুক্তরাজ্যে একটি বিজ্ঞাপনমুক্ত সাবস্ক্রিপশন সেবা চালুর সম্ভাবনা বিবেচনা করছে, যেখানে ব্যবহারকারীদের মাসিক ফি দিয়ে বিজ্ঞাপনবিহীন অভিজ্ঞতা উপভোগ করার সুযোগ দেওয়া হবে।
বৃহত্তর প্রভাব
তানিয়া ও’ক্যারলের এই জয়কে অনেকে ফেসবুক ব্যবহারকারীদের জন্য একটি “গেটওয়ে” হিসেবে দেখছেন। আইসিওর সমর্থন এবং মেটার সমঝোতার ফলে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের ব্যবহারকারীরা এখন তাদের গোপনীয়তার অধিকার আরও জোরালোভাবে দাবি করতে পারবেন। এটি প্রযুক্তি জায়ান্টদের ডাটা-নির্ভর বিজ্ঞাপন মডেলের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।