বিশেষ: সকাল হলেই বেরিয়ে পড়েন ‘বিনে পয়সার মাস্টার’, ১০ বছর ধরে করছেন ফ্রি কোচিংয়ের সেবা

সকাল হলেই বাইক নিয়ে বেরিয়ে পড়েন হংসশুভ্র পাল। এক কোচিং সেন্টার থেকে অন্য কোচিং সেন্টারে ছুটে বেড়ানোই তাঁর রুটিন। এলাকার মানুষ তাঁকে চেনেন ‘বিনে পয়সার মাস্টার’ নামে। গত দশ বছর ধরে পূর্ব মেদিনীপুরের কোলাঘাটে তেরোটি ফ্রি কোচিং সেন্টার চালিয়ে আসছেন তিনি। টাকার অভাবে যে ছাত্রছাত্রীরা ইংরেজি শিখতে পারে না, তাদের সাহায্য করতেই এই উদ্যোগ শুরু করেছিলেন বলে জানান হংসশুভ্র। শুধু পড়ানোই নয়, দুঃস্থ ছাত্রছাত্রীদের নিজের টাকায় বই-খাতাও কিনে দেন তিনি।
চাকরির স্বপ্ন থেকে সমাজসেবা
৫৮ বছর বয়সী হংসশুভ্র পাল কোনও স্কুলে শিক্ষকতা করেন না বা কোনও সংস্থায় চাকরি করেন না। ইংরেজিতে এমএ করা এই ব্যক্তি একসময় চাকরির জন্য অনেক চেষ্টা করেছিলেন। জেলার বিভিন্ন স্কুলে শিক্ষকতার জন্য আবেদন করেছিলেন তিনি। কিন্তু ম্যানেজিং কমিটির টাকার দাবি মেটাতে না পারায় একাধিক চাকরি হাতছাড়া হয় বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। এরপরই তিনি সিদ্ধান্ত নেন ছাত্রছাত্রীদের ইংরেজি পড়ানোর।
অল্প সময়ের মধ্যেই কোলাঘাটে ইংরেজির শিক্ষক হিসেবে নাম কুড়িয়ে ফেলেন হংসশুভ্র। প্রথমদিকে তাঁর কাছে পড়তে আসা অনেক ছাত্রই ফি দিতে পারত না। তখনই তিনি সিদ্ধান্ত নেন বিনে পয়সার কোচিং সেন্টার খোলার। প্রায় দশ বছর আগে কোলাঘাটের বৈষ্ণবচক, বাড়বড়িশা, কলাগেছিয়া-সহ একাধিক এলাকায় মোট তেরোটি ফ্রি কোচিং সেন্টার শুরু করেন তিনি। প্রতিটি সেন্টারে সপ্তাহে দু’দিন করে ইংরেজি পড়ান। তবে, যাদের বিশেষ কোচিং দেন, তাদের কাছ থেকে ফি নেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
শুধু পড়ানো নয়, সমাজসেবাও
দশ বছরে শতাধিক ছাত্রছাত্রীকে বিনে পয়সায় পড়িয়েছেন হংসশুভ্র। বর্তমানে তাঁর ফ্রি কোচিং সেন্টারে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ২৮১। পড়ানোর পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন এলাকায় বিনে পয়সায় অক্সিজেন সিলিন্ডার, শবদেহ বহনের স্ট্রেচার সরবরাহ, মনীষীদের স্ট্যাচু স্থাপন, রক্তদান শিবিরের আয়োজনের মতো কাজও করে চলেছেন। তাঁর ভাই একজন ইঞ্জিনিয়ার এবং এই কাজে তাঁকে সহযোগিতা করেন। হংসশুভ্রের একমাত্র মেয়ে একটি বেসরকারি সংস্থায় চাকরি করেন।
নিজের জীবন থেকে প্রেরণা
হংসশুভ্র বলেন, “ছাত্রজীবনে আমি খুব গরিব ছিলাম। তাই আমি চেষ্টা করি দুঃস্থ ছাত্রছাত্রীদের পাশে দাঁড়াতে। এখান থেকে পড়ে অনেকে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।” তাঁর এই উদ্যোগে অনেক ছাত্রছাত্রী শিক্ষার সুযোগ পেয়ে জীবনে এগিয়ে গেছে।
কোলাঘাটের বাসিন্দারা হংসশুভ্র পালকে শুধু একজন শিক্ষক হিসেবেই নয়, একজন সমাজসেবী হিসেবেও সম্মান করেন। তাঁর এই নিঃস্বার্থ কাজ এলাকায় শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে।
ছবি ক্রেডিট: এই সময়