জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যানে গণ্ডার গণনা! বাড়লো একশৃঙ্গ গণ্ডারের সংখ্যা, সংরক্ষণে জোর বন দপ্তর

পশ্চিমবঙ্গের জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যানে সাম্প্রতিক গণ্ডার গণনায় উঠে এসেছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। সমীক্ষা অনুযায়ী, রাজ্যে বর্তমানে মোট ৩৯২টি একশৃঙ্গ গণ্ডার রয়েছে। এর মধ্যে জলদাপাড়ায় ৩৩১টি এবং গোরুমারায় ৬১টি গণ্ডার পাওয়া গেছে। গণ্ডারের সংখ্যা নির্ধারণের পাশাপাশি, এই গণনা সংরক্ষণ নীতির দিক নির্দেশক হিসেবেও কাজ করবে।

গণনার মূল উদ্দেশ্য ও পদ্ধতি

গণ্ডার গণনা শুধুমাত্র সংখ্যা নির্ধারণের জন্য নয়, বরং এটি জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার, লিঙ্গ অনুপাত, বয়সভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাস এবং আবাসস্থলের বর্তমান পরিস্থিতি মূল্যায়ন করতে সাহায্য করে। এছাড়াও, শিকারিদের হুমকি ও সংরক্ষণ পরিকল্পনার জন্য তথ্য সংগ্রহের লক্ষ্যেও এই গণনা করা হয়।

চলতি বছরের মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহেই জলদাপাড়ায় গণ্ডার গণনার কাজ শুরু হয়। এবারের গণনায় “টোটাল কাউন্ট মেথড” ব্যবহার করা হয়েছে, যা সহজ ও নির্ভরযোগ্য বলে পরিচিত। ৫ ও ৬ মার্চ দুই দিন ধরে চলে এই গণনা, যাতে পুনরায় সমীক্ষার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছিল।

কীভাবে পরিচালিত হল গণ্ডার গণনা?

জলদাপাড়ায় গণ্ডার গণনার জন্য ৬৫টি নির্দিষ্ট গণনা ব্লক চিহ্নিত করা হয়েছিল। প্রতিটি ব্লকে ৬৫টি পর্যবেক্ষণ লাইন ও ১১০টি পর্যবেক্ষণ পয়েন্ট নির্ধারণ করা হয়। এর মধ্যে ২১টি ওয়াচ টাওয়ার থেকে গণ্ডার পর্যবেক্ষণ করা হয়।

এছাড়াও, গভীর অরণ্যে গণ্ডার খোঁজার জন্য ৭০টি প্রশিক্ষিত হাতি মোতায়েন করা হয়, যা বন দপ্তরের কর্মীদের ঘন জঙ্গলে সহজে প্রবেশের সুযোগ করে দেয়। জলদাপাড়ার ডিএফও প্রবীণ কাসওয়ান জানিয়েছেন, এই গণনায় পশ্চিমবঙ্গের ১৩টি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা (NGO) অংশগ্রহণ করেছিল। তাদের পক্ষ থেকে ৩৫ জন সদস্যকে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, যাতে তারা সঠিকভাবে তথ্য সংগ্রহ করতে পারেন।

গণ্ডারের সংখ্যা বৃদ্ধির ইতিবাচক সংকেত

পূর্ববর্তী রেকর্ড অনুযায়ী, জলদাপাড়ায় গণ্ডারের সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়ছে। ১৯৮৫ সালে যেখানে মাত্র ১৪টি গণ্ডার ছিল, ২০২২ সালের গণনায় সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ২৯২। এবার তা আরও বেড়ে ৩৩১-এ পৌঁছেছে, যা সংরক্ষণ প্রচেষ্টার সাফল্য নির্দেশ করে। তবে নতুন করে আবাসস্থল সংরক্ষণ এবং শিকারিদের হুমকি রোধে আরও কঠোর পদক্ষেপের প্রয়োজন রয়েছে।

পর্যটন ও অর্থনীতিতে গণ্ডারের গুরুত্ব

জলদাপাড়ার গণ্ডার দর্শনের জন্য প্রতি বছর প্রায় ১ লাখেরও বেশি পর্যটক আসেন। এটি ভারতের অন্যতম জনপ্রিয় বন্যপ্রাণ পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। গণ্ডার সাফারি স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। জলদাপাড়া সংলগ্ন ৫৩টি গ্রাম ও কাছাকাছি শহরগুলোর বহু মানুষ এই পর্যটনের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করেন।

সংরক্ষণে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

গণ্ডার সংরক্ষণে সফলতার ফলে জলদাপাড়া আজ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে। এটি ভারত সরকারের “প্রজেক্ট রাইনো”-র আওতায় সংরক্ষণ প্রচেষ্টার অন্যতম সফল উদাহরণ।

গণ্ডার গণনার ফলে যে তথ্য পাওয়া গেছে, তা ভবিষ্যতে জলদাপাড়ায় গণ্ডার সংরক্ষণ ও তাদের আবাসস্থল উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। বিশেষজ্ঞরা আশা করছেন, এই উদ্যোগের ফলে জলদাপাড়ার গণ্ডার সংরক্ষণ আরও শক্তিশালী হবে এবং এই মহামূল্যবান প্রাণীর সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।