গঙ্গাসাগরে ফের তলিয়ে যাচ্ছে কপিলমুনির আশ্রম? সমুদ্রের ঢেউয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

দোল পূর্ণিমার সময় উত্তাল সমুদ্রের বড় বড় ঢেউ আছড়ে পড়ছে গঙ্গাসাগরের কপিলমুনি আশ্রমের সামনের সমুদ্রবাঁধে। ফলে নতুন করে ভেঙে গেছে ১ থেকে ৪ নম্বর স্নানঘাটের রাস্তা। নিয়মিত তীব্র ভাঙনের জেরে কপিলমুনি মন্দিরের অস্তিত্ব এখন বিপন্ন হওয়ার পথে। একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিধ্বস্ত এই পুণ্যতীর্থের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
ভাঙনের ধাক্কায় কপিলমুনি আশ্রম
গত জানুয়ারিতে ২০২৫ সালের গঙ্গাসাগর মেলা শেষ করতে রাজ্য সরকারকে আপৎকালীন মেরামতের উপর ভরসা করতে হয়েছিল। তবে ভয়াবহ ভাঙনের কারণে ২ থেকে ৪ নম্বর স্নানঘাট পর্যন্ত পুণ্যস্নান বন্ধ রাখতে বাধ্য হয় প্রশাসন। ফলে তীর্থযাত্রীদের ১, ৪, ৫ এবং ৬ নম্বর ঘাটে স্নান সেরে বহু পথ অতিক্রম করে কপিলমুনি মন্দিরে পৌঁছতে হয়েছিল। এবার পূর্ণিমার কোটালে সমুদ্রের উচ্ছ্বাস আবারও ভাঙনের তাণ্ডব শুরু করেছে। ১ থেকে ৪ নম্বর স্নানঘাটের রাস্তা নতুন করে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা এই পবিত্র স্থানের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভাঙনের ফলে ক্রমশ কমছে কপিলমুনি আশ্রম থেকে সমুদ্রের দূরত্ব। একসময় আশ্রম থেকে সমুদ্রের দূরত্ব ছিল প্রায় ২ কিলোমিটারের বেশি, কিন্তু এখন তা কমে মাত্র ৪৫০ মিটারে এসে ঠেকেছে। সামনে দুর্যোগের মরশুম আসছে, ফলে আশ্রম রক্ষার জন্য দ্রুত পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা আরও জোরালো হয়ে উঠেছে।
স্থানীয়দের উদ্বেগ ও দাবি
স্থানীয় বাসিন্দা ও তীর্থযাত্রীরা কপিলমুনি আশ্রমের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তিত। এক স্থানীয় ব্যবসায়ী বলেন, “আমরা খুবই আতঙ্কে আছি। আমরা নদীতীরের দোকানদার। জায়গা ছোট হয়ে গেলে দোকান পড়ে যাবে। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের জীবিকা বিপন্ন হবে।” স্থানীয়রা ও ব্যবসায়ীরা দ্রুত স্থায়ী মেরামতের দাবি তুলছেন। তাঁদের মতে, শুধু আপৎকালীন ব্যবস্থায় এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।
রাজনৈতিক তরজা
কপিলমুনি আশ্রমের সামনে সমুদ্রবাঁধ ভাঙন নিয়ে রাজনৈতিক তরজাও শুরু হয়েছে। স্থানীয় বিজেপি নেতা অভিযোগ তুলে বলেন, “এটা তো নিত্যদিনের খবর হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজ্য সরকার প্রতি বছর মেলার আগে কোটি কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করে, কিন্তু তৃণমূলের নেতারা সেই টাকা চুরি করে নিচ্ছে। ফলে ভাঙন রোধে কোনও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না।” অন্যদিকে, তৃণমূলের পক্ষ থেকে এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলা হয়েছে, রাজ্য সরকার ভাঙন রোধে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে।
আশ্রমের অস্তিত্ব নিয়ে শঙ্কা
গঙ্গাসাগরের কপিলমুনি আশ্রম শুধু একটি ধর্মীয় স্থান নয়, এটি বাংলার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ পুণ্যার্থী এখানে আসেন মকর সংক্রান্তির সময় পুণ্যস্নান ও দর্শনের জন্য। কিন্তু ভাঙনের এই তীব্রতা অব্যাহত থাকলে এই ঐতিহাসিক স্থানটির অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়বে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সমুদ্রের জলস্তর বৃদ্ধি, ঘন ঘন ঝড় ও উচ্চ জলোচ্ছ্বাসের কারণে এই ভাঙন আরও তীব্র হচ্ছে।
এখন সবার দৃষ্টি প্রশাসনের দিকে। দ্রুত কার্যকর ও স্থায়ী সমাধান না হলে কপিলমুনি আশ্রমকে বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়বে। স্থানীয়রা জানান, “আমরা জন্ম থেকে এখানে আছি। সমুদ্র যদি এভাবে এগিয়ে আসে, তবে আমাদের সব শেষ হয়ে যাবে।” এই পরিস্থিতিতে সরকারের কাছে একটাই প্রশ্ন—কপিলমুনি আশ্রমকে বাঁচাতে কবে স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে?