দুর্নীতির অভিযোগ, পানিহাটির পুরসভার চেয়ারম্যান মলয় রায়কে পদত্যাগের নির্দেশ

পানিহাটি পুরসভার চেয়ারম্যান মলয় রায়কে পদত্যাগ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগের জেরে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম মঙ্গলবার মলয় রায়কে ফোন করে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশে পদত্যাগ করতে বলেন।

গত কয়েকদিন ধরে পানিহাটি পুরসভার চেয়ারম্যান মলয় রায় নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে জল্পনা চলছিল। অমরাবতী মাঠ বেআইনিভাবে দখল ও বিক্রির অভিযোগ থেকে শুরু করে পুরসভার ১২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে কুপন ছাপিয়ে চাঁদা তোলার অভিযোগে তিনি জড়িত ছিলেন। এই সমস্ত অভিযোগের প্রেক্ষিতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষুব্ধ হন এবং মলয় রায়কে পদত্যাগ করতে বলেন।

মঙ্গলবার দুপুরে রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম মলয় রায়কে ফোন করে বলেন, “আপনি পদ ছাড়ুন। মুখ্যমন্ত্রী চান আপনি চেয়ারম্যান পদ থেকে ইস্তফা দিন।” এই নির্দেশের পর মলয় রায় দলীয় নির্দেশ মেনে পদত্যাগ করতে রাজি হন। তবে তিনি দাবি করেন, দলেরই একটি অংশ তাকে ফাঁসিয়েছে এবং তিনি চক্রান্তের শিকার।

অমরাবতী মাঠ বিতর্ক
ঘটনার সূত্রপাত পানিহাটি পুর এলাকার অমরাবতী মাঠ নিয়ে। এই মাঠকে এলাকার ‘ফুসফুস’ বলা হয়। গত কয়েকদিন ধরে অভিযোগ উঠেছে, প্রায় ৮৫ বিঘার এই মাঠ বেআইনিভাবে প্রোমোটারদের কাছে বিক্রি করা হতে পারে। স্থানীয় বাসিন্দাদের আশঙ্কা, মাঠটি আবাসন প্রকল্পে পরিণত হতে পারে। এই পরিকল্পনায় শাসকদলের চেয়ারম্যান মলয় রায়ের মদত রয়েছে বলেও অভিযোগ ওঠে।

এই বিতর্কের আবহে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিষয়টি খতিয়ে দেখতে মুখ্যসচিব মনোজ পন্থকে নির্দেশ দেন। জেলা প্রশাসনের রিপোর্ট পেয়ে মুখ্যমন্ত্রী মলয় রায়কে পদত্যাগ করতে বলেন। এছাড়া, সরকার সিদ্ধান্ত নেয় যে অমরাবতী মাঠে কোনও আবাসন প্রকল্প নির্মাণ করা হবে না এবং পুরো মাঠটি সরকার অধিগ্রহণ করবে।

চাঁদা তোলার অভিযোগ
মলয় রায়ের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ উঠেছে, পুরসভার ১২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে কুপন ছাপিয়ে পরিষেবা নিতে আসা লোকজনের কাছ থেকে জোর করে এক হাজার টাকা চাঁদা নেওয়া হয়েছে। এই অভিযোগও দলের উপর মহলের কানে পৌঁছায় এবং তা নিয়ে হস্তক্ষেপ করা হয়। পরে চাঁদা নেওয়া বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয় পুর কর্তৃপক্ষ।

মলয় রায়ের প্রতিক্রিয়া
পদত্যাগের নির্দেশ পাওয়ার পর মলয় রায় দলের একাংশের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “৩৫ বছর ধরে আমি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। তৃণমূলের জন্মলগ্ন থেকে আছি। কেউ আমার বিরুদ্ধে কোনও অনৈতিক কাজের অভিযোগ করতে পারবে না। অমরাবতী মাঠ বিক্রির অভিযোগের কোনও ভিত্তি নেই। মাঠের একটি ঘাসও আমি বিক্রি করিনি। যেটা আমি করিনি, তার দায় কেন নেব?”

তিনি আরও বলেন, “মুখ্যমন্ত্রী যদি আমার পদত্যাগ চেয়ে থাকেন, তাহলে সেটাই হবে। তবে আমি বলব, দলের একাংশ আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছে। আমি আজ ষড়যন্ত্রের শিকার হলাম। দলকে বলব, তদন্ত করে ষড়যন্ত্রের পিছনে কারা রয়েছে তা খুঁজে বের করুন।”

চেয়ারম্যান পদের দৌড়
মলয় রায়ের পদত্যাগের পর পানিহাটি পুরসভার নতুন চেয়ারম্যান কে হবেন তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে চর্চা শুরু হয়েছে। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ১৭ নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূল কাউন্সিলর সোমনাথ দে চেয়ারম্যান হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে রয়েছেন। তবে আরও কয়েকটি নামও চর্চায় রয়েছে।

মলয় রায় যদি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ না করেন, তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে বলে জানা গেছে। এই ঘটনায় রাজনৈতিক মহলের একটি বড় অংশ মনে করছে, মলয় রায়ের বিরুদ্ধে উঠে আসা সমস্ত অভিযোগই তাঁর চেয়ারম্যান পদ হারানোর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।