“মানুষের পৌঁছনো প্রায় অসম্ভব”- এ পৃথিবীতেই রয়েছে মহাকাশযানের কবরখানা, জেনেনিন কোথায়?

মহাকাশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে মহাকাশে মানুষের যাতায়াত ও কর্মকাণ্ড বেড়েই চলেছে। রকেট, কৃত্রিম উপগ্রহ এবং অন্যান্য মহাকাশযান নিয়মিতভাবে মহাকাশে পাঠানো হচ্ছে। কিন্তু এই সব যানেরও একটি নির্দিষ্ট আয়ু থাকে। আয়ু শেষ হলে এগুলিকে কীভাবে নিষ্ক্রিয় বা ধ্বংস করা যায়, তা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। মহাকাশে পরিত্যক্ত যান ও যন্ত্রাংশ জমা হয়ে তৈরি করছে ‘স্পেস জাঙ্ক’ বা মহাকাশের জঞ্জাল, যা ভবিষ্যৎ মহাকাশ মিশনের জন্য হুমকিস্বরূপ।
এই সমস্যার সমাধান খুঁজতে বিজ্ঞানীরা একটি অভিনব পদ্ধতি বের করেছেন। আয়ু শেষ হওয়া মহাকাশযানগুলিকে পৃথিবীতে ফিরিয়ে এনে প্রশান্ত মহাসাগরের একটি নির্দিষ্ট স্থানে ফেলা হচ্ছে। এই স্থানটিকে ‘স্পেসক্রাফট কবরস্থান’ নামে অভিহিত করা হয়।
কেন প্রশান্ত মহাসাগর?
প্রশান্ত মহাসাগরের দক্ষিণ অংশে একটি বিশেষ অঞ্চলকে মহাকাশযান ধ্বংস করার জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে। এই স্থানটি স্থলভাগ থেকে প্রায় ২,৫০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত, যেখানে কোনো জনবসতি বা স্থলভাগ নেই। এই দূরত্ব এবং বিস্তৃত জলরাশির কারণে মহাকাশযান ধ্বংসাবশেষ থেকে মানুষের কোনো ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শূন্য।
এই অঞ্চলে ইতিমধ্যেই প্রায় ২৫০টিরও বেশি মহাকাশযানের ধ্বংসাবশেষ জলের তলায় পড়ে রয়েছে। এখানে আয়ু শেষ হওয়া মহাকাশযানগুলিকে নিরাপদে ফেলা যায়, যাতে সেগুলি কোনো প্রকার দুর্ঘটনা বা ক্ষতি ছাড়াই ধ্বংস হয়ে যায়।
আন্তর্জাতিক স্পেস স্টেশনের ভবিষ্যৎ
আন্তর্জাতিক স্পেস স্টেশন (ISS)-এর মতো বড় মহাকাশ কাঠামোগুলিও একদিন তাদের আয়ু শেষ করবে। বিজ্ঞানীরা পরিকল্পনা করেছেন যে, ISS-এর আয়ু শেষ হলে তাকেও এই ‘স্পেসক্রাফট কবরস্থান’-এ ফেলা হবে। এটি একটি জটিল প্রক্রিয়া, যার জন্য সঠিক সময় এবং নির্ভুল গণনা প্রয়োজন।
পরিবেশগত প্রভাব
মহাকাশযানের ধ্বংসাবশেষ সমুদ্রের তলায় জমা হওয়ার ফলে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের উপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। বিজ্ঞানীরা এই বিষয়ে সচেতন এবং যানগুলিকে এমনভাবে ধ্বংস করার চেষ্টা করছেন, যাতে সামুদ্রিক প্রাণীদের উপর ন্যূনতম প্রভাব পড়ে। এছাড়াও, ধ্বংসাবশেষ থেকে কোনো বিষাক্ত পদার্থ যাতে পরিবেশে ছড়িয়ে না পড়ে, সেদিকেও বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে।
মহাকাশ জঞ্জাল: একটি বৈশ্বিক সমস্যা
মহাকাশে জঞ্জালের পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে। পরিত্যক্ত উপগ্রহ, রকেটের ধ্বংসাবশেষ এবং অন্যান্য মহাকাশযানের টুকরো পৃথিবীর কক্ষপথে ভেসে বেড়াচ্ছে। এই জঞ্জাল অন্যান্য সক্রিয় মহাকাশযান এবং উপগ্রহের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। বিজ্ঞানীরা এই সমস্যা মোকাবিলায় বিভিন্ন সমাধান খুঁজছেন, যার মধ্যে ‘স্পেসক্রাফট কবরস্থান’ একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
সামনের চ্যালেঞ্জ
মহাকাশযানগুলিকে নিরাপদে ধ্বংস করার এই পদ্ধতি যদিও কার্যকর, তবুও এটি একটি অস্থায়ী সমাধান। ভবিষ্যতে মহাকাশ জঞ্জাল মোকাবিলায় আরও উন্নত প্রযুক্তি এবং কৌশল প্রয়োজন। বিজ্ঞানীরা মহাকাশযানের পুনর্ব্যবহারযোগ্যতা এবং জঞ্জাল কমাতে নানান উদ্ভাবনী পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন।
মহাকাশযানের শেষ ঠিকানা হিসেবে প্রশান্ত মহাসাগরের এই ‘স্পেসক্রাফট কবরস্থান’ মানবসৃষ্ট মহাকাশ জঞ্জালের সমস্যা মোকাবিলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান খুঁজতে বৈশ্বিক সহযোগিতা এবং প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের প্রয়োজন রয়েছে।