শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে, উচ্চ মাধ্যমিক দিচ্ছে বিশেষভাবে সক্ষম দুই কন্যা

শারীরিক প্রতিকূলতার ৯০ শতাংশ বাধাকে জয় করে মাধ্যমিকের পর এবার উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে নদীয়ার শান্তিপুরের দুই বিশেষভাবে সক্ষম কন্যা—রুমা মল্লিক ও ঝুমা মল্লিক। তাঁদের পিতা-মাতা শ্যামল ও রেখা মল্লিক অক্লান্ত পরিশ্রম করে এই দুই সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন বুনছেন। গত ৩ মার্চ থেকে রাজ্যে শুরু হওয়া উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ নিয়ে এই দুই পরীক্ষার্থী তাঁদের অদম্য ইচ্ছাশক্তির পরিচয় দিয়েছেন।

নদীয়ার শান্তিপুর ব্লকের বাগআঁচড়া এলাকার বাসিন্দা শ্যামল মল্লিক পেশায় একজন টোটোচালক। তাঁর স্ত্রী রেখা মল্লিক সংসারের কাজ সামলান। তাঁদের তিন কন্যাসন্তানের মধ্যে রুমা ও ঝুমা ৯০ শতাংশ শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছেন। রুমা ঠিকমতো হাঁটতে পারেন না, আর ঝুমা স্পষ্ট করে কথা বলতে অক্ষম। তবুও এই দুই বোনের পড়াশোনার প্রতি অসীম আগ্রহ ও জীবনযুদ্ধে জয়ী হওয়ার প্রবল ইচ্ছা তাঁদের এগিয়ে নিয়ে চলেছে।

পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছানোর যাত্রা
সোমবার সকালে শ্যামল নিজের টোটোতে করে দুই মেয়েকে শান্তিপুর মিউনিসিপাল উচ্চ বিদ্যালয়ের পরীক্ষাকেন্দ্রে নিয়ে আসেন। সঙ্গে ছিলেন রেখা। পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছানোর পর পুলিশ প্রশাসন ও বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকারা হাত ধরে রুমা ও ঝুমাকে পরীক্ষার হলে পৌঁছে দেন। এই দুই বোন গত বছর মাধ্যমিক পরীক্ষায় রাইটারের সাহায্যে সফলভাবে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। এবার তাঁরা উচ্চমাধ্যমিকে একইভাবে নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণের পথে এগিয়ে চলেছেন।

শ্যামলের সংগ্রাম ও স্বপ্ন
সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে শ্যামল মল্লিক জানান, “আমার দুই মেয়ে ছোট থেকেই প্রতিবন্ধী। একজন হাঁটতে পারে না, আরেকজন কথা বলতে পারে না। কিন্তু তাদের ইচ্ছাশক্তি অদম্য। রাইটারের সাহায্যে তারা পড়াশোনায় মন দিয়েছে। আমরা দারিদ্র্যের মধ্যেও তাদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি।” টোটো চালিয়ে দিনে যা আয় হয়, তা দিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয় তাঁকে। সরকারি সাহায্য পেলেও আর্থিক অনটন এখনও কাটেনি। তবুও শ্যামল ও রেখার চোখে স্বপ্ন—দুই মেয়েই উচ্চমাধ্যমিকে সফল হবে এবং ভবিষ্যতে নিজেদের পায়ে দাঁড়াবে।

একটি প্রেরণার গল্প
রুমা ও ঝুমার এই যাত্রা শুধু তাঁদের পরিবারের জন্যই নয়, সমাজের কাছেও একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। শারীরিক প্রতিকূলতাকে পরাজিত করে তাঁরা যে দৃঢ়তা ও সাহস দেখিয়েছেন, তা অনেকের কাছে প্রেরণার উৎস। পরীক্ষার প্রথম দিনে তাঁদের হাসিমুখ ও আত্মবিশ্বাস দেখে পরীক্ষাকেন্দ্রে উপস্থিত শিক্ষক-শিক্ষিকা ও সহপাঠীরাও মুগ্ধ।

শ্যামল বলেন, “আমরা চাই আমাদের মেয়েরা পড়াশোনা করে নিজেদের জীবন গড়ুক। তাদের স্বপ্নই আমাদের শক্তি।” রেখা যোগ করেন, “আমরা গরিব মানুষ, কিন্তু আমাদের মেয়েদের জন্য সব করতে রাজি।”

রুমা ও ঝুমা মল্লিকের এই গল্প সংকল্প ও সাহসের এক অসাধারণ উদাহরণ। শারীরিক সীমাবদ্ধতা ও আর্থিক সংকটের মধ্যেও তাঁরা পড়াশোনার মাধ্যমে নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়তে বদ্ধপরিকর। তাঁদের এই প্রচেষ্টা সফল হলে, তা শুধু শ্যামল ও রেখার পরিবারের জন্যই নয়, সমাজের প্রতিটি মানুষের কাছে অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।