“হাইকোর্টে বাংলায় শুনানি হবে সারাদিন”-ভাষা দিবস পালনে বড় উদ্যোগ বিচারপতির

‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙা একুশে ফেব্রুয়ারি…’: মাতৃভাষা দিবসে কলকাতা হাইকোর্টে শুনানি বাংলায়
কলকাতা, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ – ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙা একুশে ফেব্রুয়ারি…’—ভাষা আন্দোলনের সেই আত্মত্যাগের স্মৃতি আজও আমাদের মনে জাগ্রত। বাংলা ভাষার জন্য যে অসংখ্য তরুণের প্রাণ গিয়েছিল, তাঁদের শ্রদ্ধা জানাতে প্রতি বছর ২১ ফেব্রুয়ারি পালিত হয় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। আর এই বিশেষ দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে অভূতপূর্ব সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি অভিজিৎ বসু।
হাইকোর্টে দিনভর শুনানি বাংলায়
আগামীকাল, ২১ ফেব্রুয়ারি, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে কলকাতা হাইকোর্টে সব শুনানি হবে বাংলা ভাষায়। বিচারপতি অভিজিৎ বসু ঘোষণা করেছেন, তাঁর এজলাসে এই দিনটিতে আইনজীবীরা বাংলায় সওয়াল-জবাব করবেন। ইংরেজি বা হিন্দির পরিবর্তে মাতৃভাষা বাংলাকেই প্রাধান্য দেওয়া হবে। শুক্রবার হাইকোর্টের ১৯ নম্বর এজলাসে এই ঐতিহাসিক উদ্যোগ বাস্তবায়িত হবে। বিচারপতি বসুর এই সিদ্ধান্তকে অনেকেই বাংলা ভাষার প্রতি সম্মান ও গৌরবের প্রকাশ হিসেবে দেখছেন।
বাংলা না জানা আইনজীবীদের জন্য ব্যতিক্রম
যদিও হাইকোর্টে বহু মামলার শুনানি বাংলায় হয়, রায় সাধারণত ইংরেজিতেই দেওয়া হয়। তবে একটি বাস্তব সমস্যা হল, অনেক আইনজীবী বাংলা বলতে পারেন না। এই পরিস্থিতিতে বিচারপতি বসু জানিয়েছেন, যাঁরা বাংলায় কথা বলতে অক্ষম, তাঁরা ইংরেজিতে সওয়াল করতে পারবেন। কিন্তু যাঁরা বাংলা জানেন, তাঁদের জন্য এই দিনে শুধুমাত্র বাংলায় কথা বলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অতীতেও বাংলায় শুনানির নজির
এর আগে বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের এজলাসে বেশিরভাগ শুনানি বাংলাতেই হত। তিনি মনে করতেন, আদালতে আসা অনেক মানুষ ইংরেজি বোঝেন না বা আদালতের কার্যক্রম সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা রাখতে পারেন না। তাই সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য তিনি বাংলায় শুনানির উপর জোর দিতেন। বিচারপতি গঙ্গোপাধ্যায় ও আইনজীবীদের মধ্যে বাংলাতেই কথোপকথন হত, যা আদালতের পরিবেশকে আরও সহজলভ্য করে তুলেছিল।
কলকাতা হাইকোর্টে সাধারণত ইংরেজি প্রচলিত
কলকাতা হাইকোর্টে সাধারণত শুনানির কাজ ইংরেজিতে হয়। দেশের অন্যান্য হাইকোর্টে ইংরেজির পাশাপাশি হিন্দিতেও সওয়াল-জবাব করা হয়। তবে কলকাতায় ইংরেজিই প্রধান মাধ্যম। সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য কিছু নির্দেশনামা বাংলায় তর্জমা করা হলেও, শুনানির ক্ষেত্রে বাংলার ব্যবহার সীমিত। বিচারপতি বসুর এই উদ্যোগ এই প্রথাগত রীতিতে একটি ব্যতিক্রমী পরিবর্তন এনেছে।
মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধা
২১ ফেব্রুয়ারি শুধু বাংলা ভাষার জন্য নয়, বিশ্বের সব মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর দিন। ভাষা আন্দোলনের শহিদদের স্মরণে এই দিনটি বিশ্বব্যাপী পালিত হয়। বিচারপতি অভিজিৎ বসুর এই সিদ্ধান্ত বাংলা ভাষার গৌরব ও মর্যাদাকে আরও উজ্জ্বল করবে বলে মনে করছেন অনেকে। আইনজীবী ও আদালত সংশ্লিষ্টরা এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন।
এই পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধা ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে আদালতের দূরত্ব কমানোর একটি প্রয়াস দেখা যাচ্ছে। আগামীকালের এই ঐতিহাসিক দিনটি কলকাতা হাইকোর্টের ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।