বিশেষ: আসাদ-পরবর্তী সিরিয়ার মসনদে বসছে কারা? জেনেনিন সর্বশেষ প্রতিবেদন

সিরিয়ার ক্ষমতাচ্যুত প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ এখন কোথায় অবস্থান করছেন তা দেশটির কোনো সূত্র থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে রাশিয়ার সরকারি সংবাদমাধ্যম ক্রেমলিনের সূত্র উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, রাশিয়া আসাদকে রাজনৈতিক আশ্রয় দিয়েছে। কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে রাশিয়া এই ঘোষণা করেনি।
সোমবার (৯ ডিসেম্বর) রাশিয়ার সরকারি মিডিয়া জানিয়েছে, আসাদ ও তার পরিবার এখন রাশিয়ায় থাকবেন।
আসাদ যত দিন সিরিয়ায় ক্ষমতা দখল করে ছিলেন, তত দিন রাশিয়া ছিল তার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বন্ধুদেশ। সিরিয়া ছাড়ার পর আসাদ সপরিবারে এখন রাশিয়ায় আশ্রয় নিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
এদিকে সিরিয়ার বিদ্রোহী জোট জানিয়েছে, তারা একটি অন্তর্বর্তী শাসকগোষ্ঠীর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করার জন্য কাজ করছে। জোটটি জানিয়েছে, ‘মহান সিরিয়ান বিপ্লব আসাদ সরকারকে উৎখাত করার সংগ্রামের পর্যায় থেকে সিরিয়াকে একত্রে গড়ে তোলার সংগ্রামে উন্নীত হয়েছে।’
বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘদিনের গৃহযুদ্ধকবলিত সিরিয়াকে আবার সংঘাতের দিকে ঠেলে দেওয়া এড়াতে এমন ঘোষণা বিদ্রোহী নেতাদের পরিপক্বতার উদাহরণ।
এদিকে দেশটি দখলে নিয়ে রাজধানী দামেস্কে অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে ১৩ ঘণ্টার কারফিউ জারি করেছিল বিদ্রোহী গোষ্ঠী হায়াত তাহরির আল শাম (এইচটিএস)। গোষ্ঠীটির প্রধান আবু মোহাম্মদ জুলানি বলেছেন, নতুন সরকার গঠনের আগ পর্যন্ত সরকারের সব বিভাগ পরিচালনার দায়িত্ব পালন করবেন আসাদ সরকারেরই প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ গাজি আল জালালি।
এদিকে আসাদের প্রকৃত অবস্থান সম্পর্কে কোনো মন্তব্য না করে রাশিয়ার মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের নির্দেশ দেওয়ার পর তিনি সিরিয়া ত্যাগ করেছেন।
বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, ‘সিরিয়ান আরব প্রজাতন্ত্রে সংঘাতে অংশগ্রহণকারীদের অনেকের সঙ্গে আলোচনার পর আসাদ প্রেসিডেন্টের পদ থেকে পদত্যাগ এবং দেশ ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন ও ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ হস্তান্তরের ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশনা দেন।’
রাশিয়া আসাদের কট্টর মিত্র ছিল এবং গৃহযুদ্ধের সময় তাকে সমর্থন করার জন্য ২০১৫ সালে হস্তক্ষেপও করেছিল। কিন্তু রাশিয়ার সামরিক আয়োজন ইউক্রেনের যুদ্ধে কেন্দ্রীভূত হওয়ায়, সিরিয়ায় পরিস্থিতি প্রভাবিত করার ক্ষমতা অনেকটাই সীমিত হয়ে এসেছিল।
রাশিয়ার পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষের ডেপুটি চেয়ারম্যান কনস্টান্টিন কোসাচিভ বলেছেন, মস্কো সিরিয়ার জনগণকে সমর্থন করতে ইচ্ছুক, কিন্তু সম্ভবত অতীতের মতো সামরিকভাবে জড়িয়ে পড়বে না।
তিনি বলেন, ‘সিরিয়ার জনগণের যদি আমাদের সমর্থন প্রয়োজন হয়, তবে তা দেওয়া হবে।’
গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি সিরিয়ানদের নিজেদেরই মোকাবেলা করতে হবে বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।
নানা দেশের প্রতিক্রিয়া
ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ এক্সে একটি পোস্টে আসাদের পতনকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ‘বর্বর রাষ্ট্রের পতন হয়েছে শেষ পর্যন্ত। আমি সিরিয়ার জনগণের প্রতি শ্রদ্ধা জানাই, তাদের সাহসিকতার জন্য, তাদের ধৈর্যের জন্য। অনিশ্চয়তার এই মুহূর্তে, আমি তাদের শান্তি, স্বাধীনতা এবং ঐক্যের জন্য আমার শুভেচ্ছা জানাচ্ছি।’
তিনি বলেন, ‘সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে ফ্রান্স।’ জার্মান চ্যান্সেলর ওলাফ এক্সে দেওয়া এক বার্তায় বলেছেন, ‘আইনশৃঙ্খলা দ্রুত পুনরুদ্ধার করাই এখন গুরুত্বপূর্ণ।’
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সিরিয়ার ঘটনাবলী নিয়ে তেহরান ‘উপযুক্ত পন্থা ও অবস্থান’ গ্রহণ করবে। ইরান মনে করে, সিরিয়ানদের উচিত তাদের দেশের ভবিষ্যৎ ‘ধ্বংসাত্মক, জবরদস্তিমূলক, বিদেশি হস্তক্ষেপ ছাড়াই’ নির্ধারণ করা উচিত। তবে আসাদ সরকারের প্রধান সমর্থকদের মধ্যে একটি ছিল ইরান।
বিদ্রোহীরা দামেস্কের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার পর ইরানের দূতাবাসে হামলা চালিয়েছে। তবে ভবনটি আগেই খালি করে কূটনীতিকরা চলে গিয়েছেন বলে জানিয়েছে ইরানের গণমাধ্যম। দামেস্কের উপকণ্ঠে মাজেহ সামরিক বিমানবন্দরের কাছে সিরিয়ার সেনাবাহিনীর অস্ত্রের ডিপোতে বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক সিরিয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটস ওয়ার মনিটরের প্রধান রামি আবদেল রহমান ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেছেন, ‘মাজেহ সামরিক বিমানবন্দরের কাছে সিরিয়ান সেনাবাহিনীর চতুর্থ ডিভিশনের লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল।’ বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসও (এপি) এই আক্রমণের খবর দিয়েছে।
সিরিয়ার লক্ষ্যবস্তুতে হামলা নিয়ে ইসরায়েল প্রায়শই মন্তব্য করেনি, তবে তারা জানিয়েছে যে সিরিয়ায় ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হচ্ছে।
ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ইসরায়েল-অধিকৃত গোলান মালভূমি বরাবর সিরিয়ার সঙ্গে জাতিসংঘ-নিয়ন্ত্রিত বাফার জোনে সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সিরিয়ার বাশার আসাদের পতনকে স্বাগত জানিয়ে এটিকে একটি ‘ঐতিহাসিক দিন’ বলে উল্লেখ করেছেন।
ইরানের ‘অশুভ অক্ষ’-এর ‘মূল কেন্দ্র’ হিসেবে সিরিয়ার নাম উল্লেখ করেছেন নেতানিয়াহু।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী আরো বলেছেন, ‘হিজবুল্লাহকে আমরা যে আঘাত দিয়েছি, তার সরাসরি ফলাফল’ আসাদ সরকারের পতন।
এদিকে ইরানের আরেক ঘনিষ্ঠ মিত্র লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চুক্তির অংশ হিসেবে ৬০ দিনের মধ্যে দক্ষিণ লেবানন থেকে নিজেদের সদস্যদের প্রত্যাহার করতে সম্মত হয়েছে। নেতানিয়াহু বলেছেন, ‘আমরা কোনো শত্রুশক্তিকে আমাদের সীমান্তে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে দেব না।’
সূত্র: ডয়চে ভেলে