বিশেষ: মাতৃগর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠের সময় থেকেই সব বোঝে শিশুরা, বলছে নতুন গবেষণা

ট্রিনিট্রি কলেজ ডাবলিন এবং অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি ও আমেরিকার গবেষকরা খুঁজে বের করেছেন, সদ্যপ্রসূত শিশু তার মাতৃগর্ভ থেকে পৃথিবীতে ভূমিষ্ঠ হওয়ার প্রক্রিয়াটি সম্পর্কে পুরোপুরি ওয়াকিবহাল। অস্ত্রোপচার কিংবা প্রাকৃতিক উপায়ে যখন মাতৃগর্ভ থেকে একটি শিশুকে পৃথিবীতে আনা হয় তখন সে খুব ভালোভাবে বুঝতে পারে তার পরিচিত নিশ্চিন্ত অন্ধকার পরিবেশ থেকে নতুন এক জগতে তাকে স্থানান্তর করা হচ্ছে।

সম্পূর্ণ অপরিচিত আলোকজ্জ্বল নতুন এক জগতের স্পর্শে পেয়ে তাই তো শিশু জড়োসড়ো হয়ে যায়, চিৎকার করে কান্না করে ওঠে- যেন বলতে চায়, ‘এ আমাকে কোথায় নিয়ে এলে? এ জায়গা আমার মোটেই পছন্দ হচ্ছে না।’

‘ট্রেন্ডস ইন কগনিটিভ সাইন্স’ নামে একটি পত্রিকায় গত ১৩ অক্টোবর সাম্প্রতিক এ গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণাটি, ‘কনসাসনেস ইন দ্য ক্র্যাডল: অন ইমার্জেন্স অফ ইনফ্যান্ট এক্সপেরিয়েন্স’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে। যেখানে গবেষকরা প্রমাণ করেছেন, জন্মগতভাবে শিশুর বিকাশমান মস্তিষ্ক সচেতন অভিজ্ঞতা অর্জনে সক্ষম এবং এই অভিজ্ঞতা পরবর্তীতে তাদের আত্মবোধের জায়গা এবং পারিপার্শ্বিক পরিবেশকে আরো ভালোভাবে বুঝতে এবং অনুভব করতে সাহায্য করে।

গবেষকদের এই দলটিতে অস্ট্রেলিয়ার মোনাশ ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অফ টুবিনজেন, জার্মানির ইউনিভার্সিটি অফ মিনেসোটা, ইউএসএ এবং ট্রিনিটি কলেজ ডাবলিনের স্নায়ুবিজ্ঞানী এবং দার্শনিকরা অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।

এই গবেষণাপত্রের দুইজন প্রধান লেখকের একজন ড. টিম বেইন, মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের (মেলবোর্ন) দর্শনের অধ্যাপক বিষয়টিকে এভাবে ব্যাখ্যা করেছেন- যদিও আমরা প্রত্যেকেই একসময় শিশু ছিলাম তথাপি আমাদের কাছে শিশুদের মনোজগৎ এক বিশাল রহস্যময় জগৎ বলে মনে হয়। কারণ শিশুরা তাদের অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করতে পারে না। একটা দীর্ঘ সময় পর্যন্ত সে বলতে পারে না যে তার ক্ষুধা লেগেছে কিনা কিংবা সে ব্যথা পেয়েছে কিনা। শিশু তার সব অনুভূতি প্রকাশ করে কান্নার মাধ্যমে। এই কান্না শুনে মাকে বুঝে নিতে হয় তার শিশুর এই মুহূর্তে কোন জিনিসটি প্রয়োজন।

জীবনে একবার হলেও একটি সদ্য জন্মগ্রহণ করা শিশুকে কোলে নিয়েছেন- এমন প্রায় প্রতিটি ব্যক্তিই এটা ভেবে বিস্মিত হন যে, একটি শিশু হওয়ার চেয়ে আনন্দের আর কী হতে পারে। আমরা কেউই আসলে বড় হওয়ার পর আমাদের শিশুকালকে আর স্মরণ করতে পারি না। তবে সাধারণের মধ্যে যে একটি প্রচলিত ধারণা রয়েছে যে, শিশুর ‘কনসাসনেস’ বা ‘চেতনা’ জাগ্রত হয় ঠিক তার জন্মের সময় বা জন্মের পর কিংবা জন্মের এক বছর বা তারও পরে; এই ধারণার সাথে গবেষকরা দ্বিমত পোষণ করেছেন।

চেতনা কখন জাগ্রত হয় সে সম্পর্কে একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করতে, এই গবেষক দলটি চেতনা বিজ্ঞানের সাম্প্রতিক অগ্রগতির ওপর ভিত্তি করে গবেষণাপত্রটি তৈরি করেছে। প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে, মস্তিষ্কের ইমেজিং (ব্রেইন ইমেজিং) থেকে কিছু মার্কার পাওয়া গেছে যাদের চেতনার থেকে আলাদা করা সম্ভব হয়েছে এবং বিজ্ঞান ও চিকিৎসায় ক্রমবর্ধমানভাবে সেগুলোকে প্রয়োগ করা হচ্ছে। এই প্রথমবারের মতো শিশুদের মধ্যে এই মার্কারগুলোর তাদের চেতনা মূল্যায়ন করার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে।

গবেষণাপত্রের সহ-লেখক, লোরিনা নাসি, স্কুল অফ সাইকোলজির সহযোগী অধ্যাপক, যিনি ট্রিনিটির ‘কনসাসনেশ এবং কগনিশন গ্রুপে ’নেতৃত্ব দেন, তিনি ব্যাখ্যা করেছেন: ‘আমাদের অনুসন্ধানগুলো এটা নির্দেশ করে যে, নবজাতকরা যে কোনো বিষয় বোঝার জন্য যথেষ্ট সংবেদনশীল। তাদের প্রতি অন্যদের প্রতিক্রিয়া বোঝার মতো যথেষ্ট ক্ষমতা তাদের রয়েছে। শুধু তাই নয়, যে কোনো আচরণের বিপরীতে তারা সাড়া দিতেও সক্ষম।’

এই গবেষণাপত্রে আরেকটি বিষয় আলোকপাত করা হয়েছে, চোখে দেখতে পাওয়ার চেয়ে কানে শোনার ব্যাপারে শিশুরা অধিক পারদর্শী। তবে তারা প্রাপ্ত বয়ষ্কদের মতো এত অধিক বিষয়ে মনোযোগ দিতে পারে না। তাদের সামনে কোনো বস্তু রাখলে সেটা কি জিনিস তা বুঝতে তাদের অনেক সময় ব্যয় হয়। তবে তারা তাদের নিজস্ব অভিব্যক্তি এবং ভাষার মাধ্যমে অনেক ভাবের আদান প্রদান করতে পারে।