পেটে খিদের জ্বালায় ‘ঘাস খাচ্ছে’ গাজার ফিলিস্তিনিরা, অসহায় ভাবে দিন কাটাচ্ছে সকলে

গাজা উপত্যকায় ইসরায়েল প্রাণঘাতী হামলা ও অবরোধ অব্যাহত রাখায় সেখানকার মানবিক সংকট আরো প্রকট হয়েছে। গত ৭ অক্টোবর থেকে চলমান এই হামলায় অঞ্চলটি এখন দুর্ভিক্ষের কিনারে এসে পৌঁছেছে।

ইসরায়েলের হামলায় নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে সব ফেলে এককাপড়ে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছেন লাখ লাখ গাজাবাসী। আর উপত্যকাটির ২২ লাখের বেশি মানুষ এখন সবচেয়ে বেশি যে সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে, তা হলো খাবার। তাদের সামনে খাবার নেই, বিশুদ্ধ জলও নেই। ক্ষুধা মেটাতে তাদের অনেকেই খাচ্ছেন ঘাস, পান করছে দূষিত জল।

গাজায় দিন দিন হামলা বাড়াচ্ছে ইসরায়েল। এতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও প্রতিনিয়ত বাড়ছে।

মঙ্গলবার (৩০ জানুয়ারি) ফিলিস্তিনে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রাতভর ইসরায়েলের ভারি বোমাবর্ষণ ও বিমান হামলায় ১২৮ জন নিহত হয়েছেন। খান ইউনিস এখন এই সংঘাতের মূল কেন্দ্রবিন্দু। দক্ষিণ গাজার এই শহরটি এখন জনমানবশুণ্য এক বড় মরুভূমি।

ইসরায়েল-হামাসের চলমান যুদ্ধ ফিলিস্তিনিদের যেমন বাস্তুচ্যুত করেছে, এ কারণেই মানবিক সংকটও সবচেয়ে তীব্র হয়েছে। গাজার মানুষ ক্ষুধার্ত, বিশুদ্ধ জলর অভাবে তারা ডায়রিয়াসহ ভয়ঙ্কর রোগব্যাধীর শঙ্কা নিয়ে প্রতিটা মুহূর্ত পার করছে।

জাতিসংঘের জরুরি ত্রাণ সংস্থার প্রধান মার্টিন গ্রিফিথ বলেছেন, গাজার বাসিন্দাদের বড় একটি অংশ এখন দুর্ভিক্ষের মধ্যে আছে, যাদের অচিরেই ক্ষুধার্ত থাকতে হবে।

রাফাহ শহরের বাসিন্দা হানাদি জামাল সাইদ আল জামারা। সাত সন্তানের মা তিনি। বেঁচে থাকার জন্য প্রবল সংগ্রাম করা এই নারী সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে জানান, তারা এখন দুর্বল। তাদের পরিবারের সবার ডায়রিয়া লেগেই থাকছে। তাদের মুখ বিবর্ণ হলুদ হয়ে গেছে।

গাজার মানবিক পরিস্থিতি এতটাই শোচনীয় যে, স্বাস্থ্যকর্মীরা জামারার সন্তানদের জন্য খাবার পাঠাতে গিয়ে দেখেন পর্যাপ্ত খাবার নেই। বিশুদ্ধ জল নেই। যারা গৃহহীন শিশু রাস্তায় থাকছে, তারা বাসি রুটির জন্য কাড়াকাড়ি করছে। এরপর যখন ত্রাণ আসবে তখন ওইটুকু ত্রাণের জন্য সবার মধ্যে হট্টগোল লেগে যাবে। এভাবেই গাজার মানুষ তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে।

ইসরায়েল-হামাস চলমান সংকট বাড়ার আগে ১৭ বছর ধরে ইসরায়েল ও মিশরের আংশিক অবরোধের কারণে গাজার মানুষেরা তাদের ত্রাণের ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু ইসরায়েলের সাম্প্রতিক বোমা হামলা ও অবরোধের কারণে এই ত্রাণের পরিমাণ অনেক কমে গেছে। এ কারণে গাজার মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়েছে।

সিএনএনের প্রতিবেদন বলছে, আল জামারা হচ্ছেন গাজার সেই বিপর্যয়কর মানবিক পরিস্থিতির প্রতিফলন। জামারার ভাষায়, আমরা প্রতিদিন একটু একটু করে মরছি। আমি মনে করি, এভাবে মরার চেয়ে বোমার আঘাতে মারা যাওয়া অনেক ভালো। অন্তত আমরা শহীদের মর্যাদা পাবো। কিন্তু এখন আমরা ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় মারা যাচ্ছি।

মোহাম্মদ হামৌদা নামে বাস্তুচ্যুত এক ফিজিক্যাল থেরাপিস্ট করুণভাবে তুলে ধরছেন ওদেহ আল হাওয়া নামে তার এক সহকর্মীর মৃত্যুর কথা, যিনি তার পরিবারের জন্য জল সংগ্রহ করার চেষ্টা করছিলেন। এসময় হামৌদা বলেন, তারা ঘাস খেয়ে থাকত ও নোংরা জল পান করত।

গত ৭ অক্টোবর পর হামাসের হামলার জবাবে গাজায় পাল্টা হামলা চালানো শুরু করে ইসরায়েল। হামাস-ইসরায়েল সংঘাতে প্রায় ১২শ’ ইসরায়েলি নিহত হয়েছেন।

অন্যদিকে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইসরায়েলের হামলায় ২৬ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন অন্তত ৬৫ হাজার মানুষ।