বিশেষ: কী অপেক্ষা করছে ইমরান খানের ভাগ্যে? পাকিস্তানের রাজনীতি কি বদলাবে?

বিশ্বের অন্যতম সেরা ক্রিকেটার অধিনায়ক হিসেবে নিজের দেশকে জিতিয়েছিলেন বিশ্বকাপের ট্রফি। ১৯৯২ সালের সেই বিশ্বকাপের কয়েক বছর পরই নিজের রাজনৈতিক দল চালু করেছিলেন ইমরান খান। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর ২০১৮ সালে যখন ইমরান খান ক্ষমতায় আসেন, তখন মনে হচ্ছিলো সবকিছুই তার অনুকূলে যাচ্ছে। নিজের ক্রিকেটার জীবনে জাতীয় নায়কে পরিণত হওয়া ইমরান এক পর্যায়ে পুরোদস্তুর রাজনীতিবিদ বনে যান, এবং বহু বছরের সংগ্রামের পর পাকিস্তানের ক্ষমতা দখল করে রাখা দুই প্রধান রাজনৈতিক দলকে উচ্ছেদ করতে সক্ষম হন।

পাকিস্তানের দূষিত রাজনৈতিক অঙ্গনে ইমরান খান যেন এসেছিলেন এক দমকা তাজা হাওয়ার মতো। মনোযোগ কেড়ে নেয়ার মতো রাজনৈতিক মিছিল-র‍্যালির সাথে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার সরব উপস্থিতি মিলে তার দুর্নীতিবিরোধী বার্তাকে নতুন মাত্রা দেয়। দেশকে বদলে দিয়ে এক ‘নতুন পাকিস্তান’ গড়ার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।

পাকিস্তানের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত কোনো প্রধানমন্ত্রী পাঁচ বছরের মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেননি। তবে মনে হচ্ছিল ইমরান সেটা করেই ফেলবেন। কিন্তু শেষ পযর্ন্ত মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তাকেও ছাড়তে হলো গদি। ২০২২ সালে আস্থাভোটে হেরে বিদায় নিতে হয় তাকে।

ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে দুর্নীতি, রাজনৈতিক দাঙ্গায় উস্কানি, সামরিক বাহিনীর স্থাপনায় হামলাসহ কয়েক ডজন মামলার আসামি ইমরান খান পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের আদিয়ালা কারাগারে বন্দি আছেন।

বুধবার (৩১ জানুয়ারি) রাষ্ট্রীয় উপহার বেআইনিভাবে বিক্রি মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ও তার তার স্ত্রী বুশরা বিবিকে ১৪ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন দেশটির একটি আদালত।

কারাদণ্ডের পাশাপাশি ইমরান খানকে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ১০ বছরের জন্য অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে। এছাড়া এই দম্পতিকে ৭৮ কোটি ৭০ লাখ পাকিস্তানি রুপিও জরিমানা করা হয়েছে।

এর আগে গত মঙ্গলবার রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য ফাঁসের (সাইফার) মামলায় ইমরান খান এবং তার দল পিটিআইয়ের সহ-সভাপতি শাহ মেহমুদ কুরেশিকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেন পাকিস্তানের একটি বিশেষ আদালত।

পাকিস্তানের জাতীয় নির্বাচনের এক সপ্তাহ আগে পিটিআই নেতাকে দুই মামলায় ২৪ বছর দণ্ড দেওয়া হলো। এই রায়ের ফলে ইমরান খান ও তার দলের ভবিষ্যত অনিশ্চয়তার মুখে পড়লো। বিশেষ করে পাকিস্তানের জাতীয় নির্বাচনে জিতে ক্ষমতার রাজনীতিতে ফেরা দলটির জন্য কঠিন হয়ে পড়লো। শুধু তাই নয়, ইমরান খান আগামী ১০ বছর সরকারি কোনো পদে অধিষ্ঠিত হতে পারবেন না।

এক দশকের কিছু বেশি সময় আগে পিপিপির নেতা ইউসুফ রাজা গিলানি এবং পিএমএল-এনের নেতা নওয়াজ শরিফ একই কায়দায় সরকারি দফতর পরিচালনার অযোগ্য হয়েছিলেন। সেই ধারাবাহিকতায় তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) নেতা ইমরান খান তৃতীয় ব্যক্তি, যিনি আদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার কারণে নির্বাচনে দাঁড়ানোর যোগ্যতা হারালেন।

গিলানি ও নওয়াজকে প্রধানমন্ত্রী থাকাকালেই অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছিল; আর ইমরান খানকে অনাস্থা ভোটে প্রধানমন্ত্রীর গদি থেকে সরিয়ে দেওয়ার ১৬ মাস পর ভোটের অযোগ্য ঘোষণা করা হলো। তাদের মধ্যে নওয়াজ ও ইমরানকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

লক্ষ্য করার বিষয় হলো, বেসামরিক যে নেতাই গদিতে বসেছেন, সেই নেতাই একটা পর্যায়ে গিয়ে নিজের প্রধানমন্ত্রিত্বের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করা শুরু করে দিয়েছেন; নিজের সাংবিধানিক কর্তৃত্বের ওপর ভরসা করা শুরু করে দিয়েছেন।

কিছু ক্ষেত্রে বিপর্যয়কর পরিণতি ভোগ করার পরও তারা মনে রাখতে চান না, কারা তাদের ক্ষমতারোহণের পথ প্রসারিত করে দিয়েছিল ও কারা তাদের ক্ষমতার মসনদে যাওয়াকে সহজ করে দিয়েছিল।

প্রসঙ্গত, গত ৬৫ বছর ধরে পাকিস্তানের ক্ষমতা কাঠামোর শীর্ষে রয়েছে সামরিক বাহিনী। বিভিন্ন সময় কখনো প্রকাশ্যে, কখনো বা পর্দার আড়ালে থেকে এই বাহিনী পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও পররাষ্ট্রনীতিতে প্রভাব রেখে চলেছে এবং এখনো দেশটির বৃহত্তম অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে।