মনিপুরে দুই নারীকে নিপীড়নের ঘটনা, কঠোর অবস্থানে এবার ভারতের সুপ্রিম কোর্ট

ভারতের মণিপুর রাজ্যে সম্প্রতি নিপীড়নের শিকার দুই নারীর বক্তব্য আমলে নিয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। সেই সঙ্গে কেন্দ্র সরকার ও মণিপুরের প্রাদেশিক সরকারকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জবাব দিতে নির্দেশ দিয়েছে এই শীর্ষ আদালত।
ভারতের প্রধান বিচারপতি ধনঞ্জয় ওয়াই চন্দ্রচূড় (ডি ওয়াই চন্দ্রচূড়) জানিয়েছেন, এটা বলার সুযোগ নেই যে নারীর প্রতি সহিংসতা পশ্চিমবঙ্গসহ দেশের অন্যান্য স্থানেও হচ্ছে। এ সময় তিনি ছয়টি প্রশ্ন উত্থাপন করেন এবং কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারকে যথাযথভাবে একদিনের মধ্যে জবাব দেয়ার নির্দেশ দেন।
প্রধান বিচারপতি প্রশ্ন করেন, কীভাবে মণিপুর ইস্যু মোকাবিলা করবেন তা স্পষ্ট করেন। আপনারা কী দেশের সব কন্যার নিরাপত্তা নিশ্চিত করবেন না কী কারোরই নিরাপত্তা দিতে পারবেন না।
দুই নারীকে বিবস্ত্র করে রাস্তায় ঘোরানোর মামলায় কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারকে ছয়টি প্রশ্ন করেন আদালত। মামলা সবশেষ অবস্থা, এফআইআর, কতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, ভুক্তভোগীদের কী ধরনের আইনি সহায়তা দেয়া হয়েছে এসব স্পষ্টভাবে আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতকে জানাতে হবে।
গত ৪ মে মণিপুর রাজ্যে দুই নারীকে ধর্ষণের আগে বিবস্ত্র করে রাস্তায় ঘোরানোর ঘটনা ঘটে। এ সময় বাধা দেয়ায় এক তরুণীর কিশোর ভাইকে হত্যা করা হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, ধর্ষণের শিকার ওই দুই নারী ও তাদের কয়েকজন পুরুষ সদস্য মূলত তাদের পরিবারের সঙ্গে পালিয়ে যাচ্ছিলেন। এর মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু জাতিগোষ্ঠী মেইতেইর একদল লোক খবর পায়, তাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিয়ে কিছু মানুষ পালিয়ে যাচ্ছে। বিষয়টি যাচাই না করে ওই দলটি পালিয়ে যাওয়া খ্রিষ্টান কুকি সম্প্রদায়ের পরিবারের পিছু ধাওয়া করে। পরিবারটি পুলিশের কাছ আশ্রয় নিলে বিক্ষুব্ধ জনতা ওই পাঁচ জনকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়। সে সময় তাদের হাত থেকে ২১ বছর বয়সী বোনকে বাঁচানোর চেষ্টা করলে ১৯ বছর বয়সী ভাইকে হত্যা করা হয়।
দুই নারীকে নগ্ন করে রাস্তায় ঘোরানোর ভিডিও প্রকাশ ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণের মামলায় মূলহোতাসহ এখন পর্যন্ত চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়ে। তারা মেইতেই সম্প্রদায়ের। এই ন্যক্কারজনক ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র প্রতিবাদ ও ক্ষোভের মাঝে বৃহস্পতিবার (২০ জুলাই) রাতে গ্রেপ্তারের তথ্য জানিয়েছেন ক্ষমতাসীন বিজেপি-শাসিত রাজ্যটির মুখ্যমন্ত্রী বীরেন সিং।
রাজ্য পুলিশ জানিয়েছে, সবশেষ দুই জন গ্রেপ্তারের পর এই ঘটনায় গ্রেপ্তারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে চারজনে।
বৃহস্পতিবার সকালে এই ঘটনার মূলহোতাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ৩২ বছর বয়সী ওই ব্যক্তির নাম হুইরেম হেরাদাশ সিং। তাকে থৌবাল জেলা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। ভিডিও দেখা যায় সবুজ টি-শার্ট পরা ওই ব্যক্তি দুই নারীর একজনকে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন। এই ঘৃণ্য ঘটনা ও এর ভিডিও প্রকাশের মধ্যে ৭০ দিনের ব্যবধান এবং এই সময়ের মধ্যে পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
মুখ্যমন্ত্রী এন বীরেন সিং অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ঘটনাটির তদন্ত করতে পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছেন।
বীরেন এনডিটিভিকে বলেন, ঘটনার বিষয়ে তিনি ও রাজ্যের মুখ্যসচিবের সঙ্গে কথা বলেছেন কেন্দ্রীয় নারী ও শিশু উন্নয়ন মন্ত্রী স্মৃতি ইরানি। অপরাধীদের বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে স্মৃতিকে আশ্বস্ত করা হয়েছে।
২৬ সেকেন্ডের ভিডিওটি ধারণ করা হয়েছে গত ৪ মে। তফসিলি উপজাতি ইস্যুতে এর একদিন আগেই শুরু হয় সংখ্যাগুরু মেইতেই ও কুকি সম্প্রদায়ের মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষ। আর সে কারণে বন্ধ করে দেওয়া হয় ইন্টারনেট পরিষেবা। সেই সংঘর্ষ এখনো চলছে। এর মধ্যেই বুধবার (১৯ জুলাই) ছড়িয়ে পড়ে দুই নারীর নগ্ন ভিডিও।
এ অবস্থায় নীরবতা ভেঙে মণিপুরে নারী নির্যাতন ইস্যুতে ২০ জুলাই তীব্র ক্ষোভ জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
বৃহস্পতিবার (২০ জুলাই) পার্লামেন্টের বর্ষা অধিবেশন শুরু আগে তিনি এমন ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
নরেন্দ্র মোদি বলেন, ‘আমি এই ঘটনায় সংক্ষুব্ধ। আমি তীব্র ক্ষোভ জানাচ্ছি। মণিপুরের ঘটনায় সমাজ আজ লজ্জিত। মণিপুরের দুই কন্যার সঙ্গে যা হয়েছে তা কখনই ক্ষমা করা হবে না। দোষীরা কোনভাবেই পার পাবে না। আইন তার সর্বোচ্চ শক্তি নিয়ে এগোবে।’
একই সঙ্গে সুপ্রিম কোর্ট এক আদেশে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে যাতে তারা এই ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ভিডিও শেয়ার দেয়া বন্ধ করে দেয়।
মণিপুরে খ্রিষ্টান কুকি আদিবাসী নেতাদের ফোরাম (আইটিএলএফ) নিশ্চিত করেছে সেই দুই নারী কুকি আদিবাসী।
আইএলটিএফের পক্ষ থেকে আরো বলা হয়েছে, শুধু নগ্ন করেই ঘোরানো নয়, তাদের কাছের একটি মাঠে নিয়ে সংঘবদ্ধ ধর্ষণও করা হয়। সম্প্রতি ভিডিওটি ভাইরাল হলেও আইটিএলএফের বিবৃতি অনুসারে ঘটনাটি ৪ মে মণিপুরের রাজধানী ইম্ফল থেকে ৩৫ কিলোমিটার দূরে কাংপোকপি জেলায় ঘটেছিল। সেই সময় মেইতি জনতা তাদের উলঙ্গ অবস্থায় ধর্ষণ করার জন্য ধানক্ষেতের দিকে নিয়ে যাচ্ছিল।
ভিডিওটিতে দেখা গেছে, সেখানে উপস্থিত পুরুষেরা ক্রমাগত তাদের হয়রানি ও শ্লীলতাহানি করছে এবং নারী দু’জনকে অনুনয় বিনয় করতে দেখা গেছে।
সম্প্রতি মেইতি গোষ্ঠীর সঙ্গে কুকিদের মধ্যে ব্যাপক উত্তেজনা দেখা দেয়। বিজেপি শাসিত মণিপুরে সম্প্রতি দুই সম্প্রদায়ের লড়াইয়ে ১২০ জনের মৃত্যু হয়েছে।
সূত্র: এনডিটিভি